তৈরি পোশাকশিল্পে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় চাপে ব্যবসায়ীরা

দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে উৎপাদন ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও সেই অনুপাতে পণ্যের দাম পাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। সুতা, শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি তেল, পোশাক তৈরির উপকরণ এবং ব্যাংকঋণের সুদ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। অন্যদিকে, ক্রেতাদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত মূল্য না পাওয়া এবং বাজারে বিক্রি কমে যাওয়ায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন উদ্যোক্তারা।
বিজ্ঞাপন
নারায়ণগঞ্জের তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী ও শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি জ্বালানি সংকটও এ খাতের ওপর চাপ তৈরি করেছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহে বিঘ্ন এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ে। ফলে পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তবে বাড়তি দামের কারণে ক্রেতাদের আগ্রহ কমে যাওয়ায় বিক্রিও কমছে।
নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া এলাকার ফ্যাশন ক্লাবের স্বত্বাধিকারী মো. ছিদ্দিক বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে নানা সংকটের কারণে পোশাক উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এতে প্রতিটি পণ্যের দাম ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এর প্রভাবে ক্রেতার সংখ্যা কমেছে।
তিনি বলেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁদের বিক্রি প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে। যে পরিমাণ লাভ হচ্ছে, তা দিয়ে কোনো রকমে ব্যবসা চালিয়ে নিতে হচ্ছে। সামনে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
একই চিত্র শহরের ১ নম্বর রেলগেট এলাকার মাহমুদুল ফ্যাশনে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক মো. খলিল বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই ব্যবসার অবস্থা ভালো নয়। বর্তমানে দুর্গাপূজার মৌসুম চলায় সাময়িকভাবে কিছুটা ভালো ব্যবসার আশা করছেন তাঁরা। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো অনুকূলে নেই। বিভিন্ন পণ্যের দাম ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
বিজ্ঞাপন
হাবিব কমপ্লেক্সের নজরুল হোসিয়ারী অ্যান্ড গার্মেন্টসের স্বত্বাধিকারী মো. নজরুল ইসলাম দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘আমি প্রায় ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে বেচাকেনার অবস্থা খুবই খারাপ। আমাদের উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। কিন্তু বিক্রি হচ্ছে কম।’
তিনি আরও বলেন, ‘যারা খুচরা বাজারে বিক্রি করে তারা এখন আগের মতো মালামাল ক্রয় করছে না। কারণ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি হওয়ায় সবকিছুতেই প্রভাব পড়েছে। আমরা ক্ষতিগ্রস্তের মধ্যে আছি। আমার ব্যবসায়িক জীবনে কখনও এরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি।’
হাবিব কমপ্লেক্স ফেডারেল কমিটির সভাপতি আব্দুল আউয়াল বলেন, তাঁদের ব্যবসা প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে। পণ্যের দাম আগের তুলনায় বাড়লেও বিক্রি বাড়ছে না। তাঁর মতে, বিভিন্ন কারণে অনেক ব্যবসায়ী বর্তমানে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
বিজ্ঞাপন
উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাড়ছে না আয়
শুধু খুচরা ব্যবসা নয়, উৎপাদন পর্যায়েও একই ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। আর এস কম্পোজিটের ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান ওয়াহিদুল ইসলাম জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁদের উৎপাদন খরচ প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। তবে ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আয় বাড়েনি।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মজিবুর রহমান বলেন, সুতা, শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পোশাক তৈরির আনুষঙ্গিক উপকরণ এবং ব্যাংকঋণের সুদ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে বাড়তি দামের যৌক্তিকতা তুলে ধরলেও প্রত্যাশিত মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বিভিন্ন ইস্যুতে সুতার দাম, শ্রমের মজুরি, বিদ্যুৎ-গ্যাস, এক্সেসরিজ কস্ট এবং ব্যাংকের ইন্টারেস্ট বেড়েছে। এসব বিষয়ে আমরা ক্রেতাদের সঙ্গে যখন কথা বলি, তখন তারা বলে আপনাকেও লাভ করতে হবে, আমাকেও লাভ করতে হবে। বিদেশি ক্রেতারা বলে, আমাদের দেশে বিক্রি মূল্য বাড়ে নাই। তোমরা যে পরিমাণ খরচের কথা বলছো, আমরা এই খরচ দিয়ে পণ্য নিতে পারছি না। তখন আমাদের বাধ্য হয়েই পণ্যের মূল্য কমাতে হয়।’
মজিবুর রহমান আরও বলেন, উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় আগের তুলনায় অর্ডার কমেছে। গত বছর তাঁরা অর্ডার সংকটে ছিলেন। চলতি বছর অর্ডার থাকলেও উৎপাদন খরচের তুলনায় পণ্যের মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। কোনো কোনো ক্রেতা গত বছরের চেয়েও কম দামে পণ্য নিতে চাইছেন। এতে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সুতার বাজারেও মন্দার প্রভাব
বিজ্ঞাপন
তৈরি পোশাকশিল্পের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত সুতার ব্যবসাও সংকটের বাইরে নয়। বাংলাদেশ ইয়ার্ন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি মজিবুর রহমান বলেন, জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সুতার দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে তাঁদের ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তিনি জানান, বিশেষ করে জিন্সের কাপড় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা সংকুচিত হচ্ছে। পোশাক প্রস্তুতকারকেরা উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ায় সুতার চাহিদাও কমছে। এতে সুতার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক চাপে পড়ছে।
সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি মোরশেদ সারোয়ার সোহেল বলেন, গত দুই বছরে বিভিন্ন খাতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। সুতা, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রতিবছর সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শ্রমিকদের মজুরিও বাড়ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংকঋণের সুদের হার ১৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। কিন্তু ক্রেতাদের কাছ থেকে সেই অনুপাতে মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, ‘ক্রেতাদের কাছ থেকে মূল্য পেতে হলে গার্মেন্টস মালিকদের সম্মিলিতভাবে যা করা উচিত সেক্ষেত্রে পিছিয়ে আছি। অনেক সময় গার্মেন্টস মালিকরা কত কম মূল্যে পণ্য ছাড়া যায় সেই প্রতিযোগিতা করে থাকে। এ বিষয়ে তদারকি প্রয়োজন। গত বছর বৈদেশিক অবস্থার কারণে চাহিদা অনেক কমে গিয়েছিলো, তবে এ বছর বাড়ছে। আমরা অন্য দেশের তুলনায় সরকারি সুযোগ-সুবিধা অনেক কম পেয়ে থাকি। আশা করি এই সরকার ব্যবসায়ীবান্ধব হয়ে আমাদের দিকে নজর দেবে।’
শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে উঠে এসেছে, উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে ব্যবধান কমানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে কাঁচামাল ও পরিচালন ব্যয়ের চাপ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কম দামে পণ্য কেনার প্রবণতা—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন উদ্যোক্তারা।
ব্যবসায়ীদের মতে, এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, ব্যাংকঋণের ব্যয় কমানো এবং বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে ন্যায্য মূল্য নির্ধারণে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে সরকারি নীতিগত সহায়তা ও কার্যকর তদারকির ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা।








