Logo

‘ম্যানুয়ালে’র অভিশাপে ৩ মাস বেতনহীন ১১০০ কারিগরি শিক্ষক

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৯ এপ্রিল, ২০২৬, ১৩:৩৪
‘ম্যানুয়ালে’র অভিশাপে ৩ মাস বেতনহীন ১১০০ কারিগরি শিক্ষক
ছবি: সংগৃহীত

বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) থেকে সুপারিশ পেয়ে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দেশের বিভিন্ন কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগ দেন প্রায় ১১০০ শিক্ষক। তবে দায়িত্ব পালন শুরু করলেও প্রথম তিন মাসের বেতন থেকে এখনো বঞ্চিত তারা। এমপিও কার্যকর হয় ডিসেম্বর থেকে, ফলে সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর—এই তিন মাস কোনো পারিশ্রমিক পাননি এসব শিক্ষক।

বিজ্ঞাপন

কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীন ষষ্ঠ গণবিজ্ঞপ্তিতে নিয়োগ পাওয়া এসব শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া বেতনের দাবিতে বিভিন্ন দপ্তরে ধর্ণা দিয়ে আসছেন। নির্দিষ্ট কোনো সমাধান না পেয়ে অনেকেই হতাশ হয়ে পড়েছেন, কেউ কেউ প্রকাশ করেছেন তীব্র ক্ষোভ।

শিক্ষকদের অভিযোগ, একই সময়ে সাধারণ স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসায় নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা শুরু থেকেই নিয়মিত বেতন পেলেও তাদের ক্ষেত্রে অজানা কারণে তা বিলম্বিত করা হয়েছে। বিষয়টিকে তারা সুস্পষ্ট বৈষম্য হিসেবে দেখছেন।

তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষকরা সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে যোগদান করেন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দ্রুত জমা দেন। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতা ও ম্যানুয়াল পদ্ধতির কারণে এমপিও কার্যকর করতে দেরি হয়। ফলস্বরূপ, ডিসেম্বর থেকে বেতন চালু হলেও আগের তিন মাসের অর্থ পুরোপুরি আটকে যায়।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষকদের অভিযোগ, অধিদপ্তর ইচ্ছাকৃতভাবে এমপিও কার্যকর পিছিয়ে দিয়েছে। তাদের দাবি, একই মন্ত্রণালয়ের আওতায় থাকা অন্যান্য অধিদপ্তর যদি যোগদানের মাস থেকেই বেতন দিতে পারে, তাহলে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের ক্ষেত্রে তা সম্ভব না হওয়ার কোনো যুক্তি নেই।

বেতন না পেয়ে শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের পথ বেছে নিয়েছেন শিক্ষকরা। সম্প্রতি তারা কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকও করেন। তবে তাতে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।

বিজ্ঞাপন

১২ এপ্রিল সারা দেশ থেকে আসা শিক্ষকরা অধিদপ্তরের সামনে মানববন্ধন করেন। সেখানে অংশ নেওয়া অনেকেই জানান, যোগদানের পর ধার-দেনা করে জীবনযাপন করতে হয়েছে তাদের। এখনো সেই ঋণের বোঝা টানছেন তারা।

একজন শিক্ষক বলেন, শিক্ষকতা পেশার মর্যাদা থাকলেও বাস্তবে অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতায় পড়তে হয়েছে। আরেকজন জানান, অন্য বিভাগের শিক্ষকরা নিয়মিত বেতন পেলেও তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

এ সমস্যা নতুন নয় বলেও জানিয়েছেন আগের ব্যাচের শিক্ষকরা। পূর্ববর্তী নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যেও এমন বহু ঘটনা রয়েছে, যেখানে ৫ থেকে ৭ মাস পর্যন্ত বেতন ছাড়াই কাজ করতে হয়েছে। পরে এমপিও কার্যকর হওয়ার পর আংশিক বেতন দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করেন, আবেদন প্রক্রিয়া জটিল এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে এমপিও পেতে ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগে। এই পুরো সময়টায় তাদের বিনা বেতনে কাজ করতে হয়।

সাম্প্রতিক কিছু নিয়োগ ও এমপিও অনুমোদনের অফিস আদেশ বিশ্লেষণেও একই চিত্র উঠে এসেছে। সেখানে দেখা যায়, অধিকাংশ শিক্ষকই যোগদানের মাস থেকে বেতন পাননি। অনেককে ৩ মাস থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১১ মাস পর্যন্ত বেতনহীন অবস্থায় কাজ করতে হয়েছে।

অফিস আদেশের একটি শর্ত অনুযায়ী, এমপিও কার্যকরের আগের সময়ের কোনো অর্থ উত্তোলনের সুযোগ নেই—যা কার্যত বকেয়া বেতন পাওয়ার পথ বন্ধ করে দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে জানতে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া মেলেনি।

কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এমপিও প্রক্রিয়ার জটিলতা ও ম্যানুয়াল ব্যবস্থার কারণেই এই বিলম্ব হচ্ছে। ধীরে ধীরে পুরো প্রক্রিয়াকে স্বয়ংক্রিয় করার কাজ চলছে বলেও জানানো হয়।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, নীতিমালা অনুযায়ী যোগদানের তারিখ থেকেই শিক্ষকদের বেতন প্রাপ্য হিসেবে বিবেচিত হবে এবং তারা বঞ্চিত হবেন না। তবে বাস্তবে এখনো সেই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

শিক্ষকদের মধ্যে এখন প্রশ্ন উঠেছে—কাজের শুরু থেকেই পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার যে নীতিগত অবস্থানের কথা বলা হয়েছিল, তা বাস্তবে কেন কার্যকর হচ্ছে না? দুই মাসের বেশি সময় পার হলেও পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় ক্ষোভ আরও বাড়ছে।

বেতনবঞ্চিত শিক্ষকরা অবিলম্বে তাদের বকেয়া পরিশোধের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে মানসম্মত কারিগরি শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আন্দোলন আরও জোরদার করারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD