জন্মদিনে এআই নিয়ে তরুণ মিউজিশিয়ানদের জন্য বিশেষ বার্তা জেমস

জনপ্রিয় ব্যান্ডশিল্পী মাহফুজ আনাম জেমসের ৬২তম জন্মদিন আজ ২ অক্টোবর। ১৯৬৪ সালের এই দিনে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী দীর্ঘ সংগীতজীবনে উপহার দিয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গান। জন্মদিন উপলক্ষে নিজের সংগীতজীবন, বর্তমান সংগীতাঙ্গন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নতুন গান ও তরুণ শিল্পীদের নিয়ে কথা বলেছেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
জেমস জানান, নিজে কখনো ঘটা করে জন্মদিন পালন করেন না। তবে ভক্তরা দিনটি নিজেদের মতো করে উদযাপন করেন এবং তাদের ভালোবাসা ও আয়োজন দেখতে তার ভালো লাগে।
নব্বইয়ের দশকের সময়ের সঙ্গে বর্তমান সময়ের সংগীতচর্চায় বড় কোনো পার্থক্য দেখেন না জেমস। তার মতে, আগে যেভাবে গান তৈরি ও পরিবেশনের কথা ভাবতেন, এখনো একইভাবে ভাবেন। পরিবর্তনের প্রসঙ্গে মজা করে নিজের চুল কিছুটা কমে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
বর্তমান সংগীতাঙ্গনের পরিবর্তন বোঝাতে ফটোগ্রাফির উদাহরণ দেন জেমস। তার মতে, একসময় ফিল্মনির্ভর ফটোগ্রাফির আলাদা গুরুত্ব থাকলেও এখন মুঠোফোন ও ডিজিটাল প্রযুক্তির কারণে যে কেউ ছবি তুলতে পারেন। সংগীতেও অ্যানালগ মাধ্যম থেকে ডিজিটাল ও স্ট্রিমিংনির্ভর ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এসেছে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
ইউটিউব ও স্পটিফাইয়ের মতো প্ল্যাটফর্মে সহজেই গান শোনা গেলেও এতে গানের আর্থিক মূল্য কমেছে বলে মনে করেন তিনি। জেমসের ভাষ্য, বর্তমান প্রজন্মের অনেক মিউজিশিয়ান আগের সময়ের শিল্পীদের চেয়েও বেশি প্রতিভাবান। কিন্তু শুধু স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করে পেশাগতভাবে টিকে থাকা কঠিন। সরাসরি মঞ্চে ভালো পরিবেশন করতে পারা শিল্পীরা তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পাবেন বলে মনে করেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সংগীতের সৃজনশীলতায় বাধা তৈরি করছে বলে মনে করেন না জেমস। তার মতে, সংগীত এখন অনেকের কাছে পেশার পাশাপাশি ভালোবাসার বিষয়ও। কোডিংসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেও প্রযুক্তির পরিবর্তন ঘটছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে শিল্পের অনেক ধরন বদলে যেতে বা হারিয়ে যেতে পারে। তবে মিউজিশিয়ানদের এআই ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ থাকলে সেটি কাজে লাগানো উচিত।
ভক্তদের নতুন গান শোনানোর ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন জেমস। তবে দেশ-বিদেশে কনসার্ট, সফর ও সরাসরি পরিবেশনার ব্যস্ততায় নিয়মিত স্টুডিওতে সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে এখনই ৯ বা ১০টি গান নিয়ে পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম প্রকাশের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। স্বতঃস্ফূর্তভাবে গান এলে অবশ্যই তা প্রকাশ করবেন বলে জানান তিনি।
তরুণ শিল্পীদের তার গান কাভার করা নিয়েও কোনো আপত্তি নেই জেমসের। তিনি মনে করেন, সংস্কৃতি নদীর মতো—নিজস্ব গতিতে তাকে প্রবাহিত হতে দিতে হয়। গান মানুষের শোনা ও নিজেদের মতো করে গাওয়ার জন্যই তৈরি, তাই যে যেভাবে গান গাইতে চান, তাকে সেই স্বাধীনতা দেওয়া উচিত।
বিজ্ঞাপন
কবি শামসুর রাহমানের সঙ্গে কাজের স্মৃতিও তুলে ধরেন জেমস। কবি তার জন্য বেশ কয়েকটি গান লিখেছিলেন। তবে সেগুলো রেকর্ড করা হয়নি এবং পরবর্তী সময়ে হারিয়ে যায়। শামসুর রাহমানের লেখা ‘তারায় তারায়’ গানটির সঙ্গে নিজের অনেক স্মৃতি রয়েছে বলে জানান তিনি। বর্তমানে মঞ্চে পরিবেশন করা গানগুলোর মধ্যে এটিকে নিজের অন্যতম প্রিয় গান হিসেবেও উল্লেখ করেন।
প্রয়াত গিটারবাদক নিলয় দাসের কথাও স্মরণ করেন জেমস। ‘সারগাম’ স্টুডিওতে একসময় নিলয়ের সঙ্গে অনেক সময় কাটিয়েছেন তিনি। পরে তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয় এবং নিলয়ের মৃত্যুর আগে আর দেখা হয়নি। পুরোনো মানুষগুলোকে তিনি খুব মিস করেন বলেও জানান।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করে জেমস বলেন, তাদের মধ্যে ছিল বন্ধুত্বের পাশাপাশি সুস্থ প্রতিযোগিতাও। একসময় তারা একে অন্যের রেকর্ডিংয়ে যেতেন এবং স্টুডিওতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা ও সংগীত নিয়ে আলোচনা করতেন। এখন সংগীতচর্চা অনেকটাই ঘরকেন্দ্রিক হয়ে যাওয়ায় শিল্পীদের মধ্যে আগের মতো সরাসরি যোগাযোগ ও আড্ডা নেই বলে মনে করেন তিনি।
আইয়ুব বাচ্চুকে এখনো খুব মনে পড়ে জানিয়ে জেমস বলেন, বাচ্চু ছিলেন আড্ডাপ্রিয় ও রসিক মানুষ। তার চলে যাওয়াকে এখনো মেনে নিতে কষ্ট হয় বলেও জানান তিনি।
বিজ্ঞাপন
দীর্ঘ সংগীতজীবনে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব করেন না জেমস। জীবনের আনন্দ ও দুঃখ—সবকিছুর মধ্যেই আনন্দ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। তার মতে, দুঃখ আঁকড়ে না ধরে সেটিকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়াই ভালো।
নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের প্রতি জেমসের পরামর্শ, সংগীতকে ভালোবাসা ও আগ্রহ থেকেই গ্রহণ করতে হবে। অর্থ, সুবিধা বা ক্ষমতার উদ্দেশ্যে সংগীতচর্চা করলে শেষ পর্যন্ত হতাশ হতে হবে বলে মনে করেন তিনি। তাই কোনো স্বার্থের কথা না ভেবে ভালোবেসে সংগীতচর্চা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এই ব্যান্ড তারকা।








