যুদ্ধের ময়দানে একা ইরান, কেন নিঃশব্দে মুসলিম বিশ্ব?

দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। যদিও এই যুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন দেশের মুসলিমদের ওপর, মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো কার্যত সরাসরি ইরানকে সাহায্য করতে এগোয়নি। বরং অনেক দেশই ইরানকে হুমকিস্বরূপ বিবেচনা করছে।
বিজ্ঞাপন
মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে সংহতির অভাব, পারস্পরিক অবিশ্বাস, জাতীয় স্বার্থ এবং পশ্চিমা শক্তি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতার মতো বাস্তব কারণগুলো ইরানের পাশে দাঁড়াতে বাধা তৈরি করছে। অনিশ্চিত পরিণতির যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়েও দেশগুলো মধ্যে অনীহা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে নিজেদেরকে মুসলিম বিশ্বের রক্ষক এবং ইসলামের সম্প্রদায়ের জন্য মানবিক বার্তা বহনকারী রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে রমজান মাসের মাঝখানে আরব দেশগুলোর ওপর হামলা চালানোর কারণে এই ভাবমূর্তিতে দাগ লেগেছে। পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে আঞ্চলিক প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার চেষ্টা ও প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তারের পদক্ষেপগুলোও মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন এবং সন্দেহ তৈরি করেছে।
বিজ্ঞাপন
ইরানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপটও মুসলিম বিশ্বের সমর্থন পেতে বাধা সৃষ্টি করছে। বিশ্বের ১৮০ কোটি মুসলিমের মধ্যে প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ সুন্নি, যেখানে শিয়াদের সংখ্যা প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। ইরান শিয়াদের সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হওয়ায় এবং সুন্নি রাষ্ট্রগুলোতে হামলা চালানোর কারণে সুনির্দিষ্ট সংহতি তৈরি হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিয়াদের সঙ্গে সুন্নিদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা কঠিন, বিশেষ করে যখন ইরান তাদের সুন্নি প্রতিবেশীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে।
ইরানের পদক্ষেপগুলোকে অনেক আরব দেশ ফিলিস্তিন ইস্যুর রক্ষকের পদক্ষেপ হিসেবে দেখার চেয়ে তার আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং ক্ষমতা সংহতির প্রচেষ্টা হিসেবে মূল্যায়ন করছে। এছাড়া পারমাণবিক শক্তি অর্জনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ফলে মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশ ইরানের পাশে দাঁড়াতে দ্বিধা বোধ করছে।
বিজ্ঞাপন
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, ইরান বর্তমানে আঞ্চলিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এর দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক এবং সামরিক কৌশলগুলো মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে তার সম্পর্ককে জটিল করেছে। ফলে ইরানের ওপর চাপ বৃদ্ধি পেলেও এই অঞ্চলের মুসলিম দেশগুলো সরাসরি হস্তক্ষেপে অনীহা দেখাচ্ছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করছে, মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য এখন চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ইরান সাম্প্রতিক হামলা ও তার আঞ্চলিক নীতির কারণে মুসলিম বিশ্বের সমর্থন হারিয়ে ফেলেছে এবং প্রতিবেশী রাজতন্ত্রগুলো তার উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে হুমকি হিসেবে দেখছে।
বিজ্ঞাপন
ফলে দেখা যাচ্ছে, ধর্মীয় সম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে মুসলিম বিশ্বে ঐক্য কল্পনা করা হলেও বাস্তবে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থই প্রাধান্য পাচ্ছে। ইরান তার প্রভাব পুনরুদ্ধার করতে চাইলেও, মুসলিম বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো এখন নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে দূরত্ব বজায় রেখেছে।
এভাবে বর্তমান যুদ্ধ ও সংঘাত ইরানের জন্য চরমভাবে জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে মুসলিম বিশ্বের সমর্থন নেই এবং তার আঞ্চলিক প্রভাবও সীমিত হয়ে পড়েছে।








