শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানও কি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে জড়াচ্ছে?

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় জটিল পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারে পাকিস্তান। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি আরবের উত্তেজনা বাড়তে থাকলে ইসলামাবাদকে একদিকে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা, অন্যদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার—দুই দিকই সামলাতে হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে চার বছরের যুদ্ধবিরতির পর গত সোমবার সৌদি আরবের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। তাদের দাবি, সৌদি বাহিনী হুথি-নিয়ন্ত্রিত একটি বিমানবন্দরে হামলা চালানোর জবাব হিসেবেই এ আক্রমণ করা হয়েছে। এর ফলে দুই পক্ষের সীমান্তে আবারও উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি পাকিস্তানকে আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারে। কারণ গত বছর সৌদি আরবের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে ইসলামাবাদ। সেই চুক্তির আওতায় বর্তমানে সৌদি আরবে পাকিস্তানের হাজারো সেনা এবং একটি যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রন মোতায়েন রয়েছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাকিস্তানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, দেশটির বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্ব ইরানকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, সৌদি আরবের ওপর হামলাকে পাকিস্তানের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এটিকে তারা ‘রেড লাইন’ হিসেবে দেখছে।
পাকিস্তানের নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুহাম্মদ আমির রানা বলেন, উত্তেজনা এত দ্রুত বাড়বে বলে ইসলামাবাদ ধারণা করেনি। ইয়েমেন সীমান্তের কাছে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাদের কারণে হুথিদের হামলা অব্যাহত থাকলে তারা সরাসরি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
এ ছাড়া লোহিত সাগরে অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পেলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌপথ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাকিস্তানের জ্বালানি আমদানির জন্য এই রুট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞাপন
অবসরপ্রাপ্ত পাকিস্তানি জেনারেল গুলাম মুস্তাফা বলেন, বর্তমানে পাকিস্তান সব পক্ষকে সংযত রাখার চেষ্টা করছে। তবে হুথিরা যদি সৌদি আরবের ভেতরে আরও গভীরে হামলা চালায়, তাহলে পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যেতে পারে।
এদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ইসলামাবাদ। পাকিস্তানের দুই সরকারি কর্মকর্তার দাবি, প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের অবস্থানের সঙ্গে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর অবস্থানের পার্থক্য ক্রমেই বাড়ছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মুহাম্মদ আলী বলেন, ইরানে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সামরিক বাহিনীর প্রভাব আগের তুলনায় বেড়েছে এবং পাকিস্তান বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।
বিজ্ঞাপন
সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে ইরানের একটি প্রতিনিধিদলের ইসলামাবাদ সফরও কয়েকদিন পিছিয়ে যায়। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনির নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি নির্ধারিত সময়ের দুই দিন পর পাকিস্তানে পৌঁছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা নিয়ে আলোচনা করে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি বলেছেন, ইসলামাবাদ সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানাচ্ছে। তার ভাষায়, টেকসই সমাধানের জন্য সংলাপ ও কূটনীতির কোনো বিকল্প নেই।
একদিকে সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা অংশীদার, অন্যদিকে প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা এখন পাকিস্তানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনার কারণে দেশটির জ্বালানি সরবরাহেও প্রভাব পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আগেভাগে বন্ধসহ বিভিন্ন জরুরি পদক্ষেপ নিতে হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য কেবল কূটনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি নয়, বরং জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ সচল রাখাও। এক কর্মকর্তা বলেন, মধ্যস্থতার প্রচেষ্টায় তারা অনেক বিনিয়োগ করেছে এবং সেটি অব্যাহত রাখতে চায়।
তবে আরেক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, যুদ্ধের অবসান সবার জন্যই প্রয়োজন। কিন্তু সৌদি আরব সহায়তা চাইলে পাকিস্তান তাদের পাশে দাঁড়াবে—এ বিষয়ে কোনো দ্বিধা নেই।
বিজ্ঞাপন
সূত্র: রয়টার্স








