Logo

যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে মধ্যপ্রাচ্য, টালমাটাল বিশ্ব অর্থনীতি

profile picture
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৭ জুলাই, ২০২৬, ১৩:০৭
যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে মধ্যপ্রাচ্য, টালমাটাল বিশ্ব অর্থনীতি
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা ভেঙে গিয়ে উভয় পক্ষের হামলা এখন সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগর ঘিরে উত্তেজনা বাড়ায় বিশ্ববাজারে নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সাম্প্রতিক কয়েক দিনে ইরানের সিরিক, বুশেহর, বান্দার আব্বাস ও ইরানশাহরসহ বিভিন্ন এলাকায় মার্কিন হামলার খবর পাওয়া গেছে। ইরানের দাবি, এসব হামলায় সেতু, রেললাইন, বন্দর, বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং আবাসিক এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খামির বন্দরের কাছে দুটি সেতুতে হামলায় দুইজন নিহত ও চারজন আহত হয়েছেন। এছাড়া বান্দার আব্বাসের একটি আবাসিক এলাকায় হামলায় একজন নিহত এবং আটজন আহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

অন্যদিকে ইরানও পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখেছে। তেহরানের দাবি, বাহরাইনে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। কুয়েত জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে। এতে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আরও বেড়েছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

কয়েক সপ্তাহ আগেও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে একটি সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেওয়ায় সেই উদ্যোগ ভেস্তে যায়। এরপরই উভয় পক্ষ আবারও সামরিক অভিযান শুরু করে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কংগ্রেসে পাঠানো এক চিঠিতে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযানের ঘোষণা দিয়েছেন। তার ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় এই পদক্ষেপ প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইরান আলোচনায় না ফিরলে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে আরও হামলা চালানো হবে।

এর জবাবে ইরানের খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাঘারি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি অবকাঠামোতে হামলা বাড়ায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোও ইরানের হামলার বাইরে থাকবে না। তিনি হরমুজ প্রণালিকে ইরানের ‘অলঙ্ঘনীয় লাল রেখা’ হিসেবে উল্লেখ করে সেখানে বিদেশি হস্তক্ষেপ মেনে না নেওয়ার ঘোষণা দেন।

বিজ্ঞাপন

এদিকে জাতীয় নিরাপত্তা ও হরমুজ প্রণালিতে সার্বভৌম অধিকার রক্ষার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তি থেকেও সরে এসেছে ইরান বলে জানিয়েছেন দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি।

যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলা চালায়, তাহলে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুট বন্ধের জন্য ইয়েমেনের হুথি আন্দোলনকে প্রস্তুত থাকতে বলেছে তেহরান। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি, সম্ভাব্য এই পরিস্থিতি বিশ্ববাজারে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। অন্যদিকে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান নৌপথ লোহিত সাগর। এই দুটি রুটে দীর্ঘমেয়াদি সংকট দেখা দিলে জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে পড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল ৮৫ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দামও প্রায় ৮০ ডলারে পৌঁছেছে। মাত্র এক সপ্তাহে দুই ধরনের তেলের দাম প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বিশ্ব শেয়ারবাজারেও পড়েছে। এশিয়ার বিভিন্ন বাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। জাপানের নিক্কেই-২২৫ সূচক একদিনেই ৩ শতাংশের বেশি কমেছে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ায় নিরাপদ সম্পদে বিনিয়োগের প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট দ্রুত কূটনৈতিকভাবে সমাধান না হলে এর প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরও গভীর হবে। তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী হবে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়বে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এটি শুধু আঞ্চলিক সংকট হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্যও বড় ধরনের হুমকিতে পরিণত হতে পারে।

সূত্র: রয়টার্স, আল জাজিরা ও সিএনএন

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD