বেলুচিস্তানের শান্ত এলাকাও এখন রণক্ষেত্র, চাপে পাকিস্তান সরকার

পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বেলুচিস্তানে নতুন করে সহিংসতার বিস্তার ঘটছে। দীর্ঘদিন তুলনামূলক শান্ত থাকা পশতুন-অধ্যুষিত উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলোও এখন সশস্ত্র হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এতে নিরাপত্তা পরিস্থিতির পাশাপাশি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপও বাড়ছে পাকিস্তান সরকারের ওপর।
বিজ্ঞাপন
প্রায় দুই দশক ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সশস্ত্র বিদ্রোহে জর্জরিত বেলুচিস্তানের পশতুন অধ্যুষিত কয়েকটি এলাকা এতদিন বড় ধরনের সংঘাত থেকে অনেকটাই বাইরে ছিল। কিন্তু চলতি বছরের জুন থেকে পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন দেখা দেয়। এরপর কয়েক মাসে পাকিস্তানি তালেবান বা টিটিপি এবং বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর হামলা ওই এলাকাগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
গত ১ সেপ্টেম্বর পশতুন-অধ্যুষিত পিশিন জেলার জিয়ারাত ক্রস এলাকায় একটি কাস্টমস স্থাপনায় হামলা হয়। পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী দাবি করে, টিটিপি ওই হামলা চালিয়েছিল এবং তারা হামলাটি প্রতিহত করেছে। এতে কয়েকজন হামলাকারী নিহত হওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনী ও কাস্টমসের ছয় সদস্য নিহত হন।
এর তিন দিন পর কোয়েটার উপকণ্ঠের শাবান এলাকায় পরিচালিত আরেক অভিযানে ২৬ টিটিপি সদস্যকে হত্যার দাবি করে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী।
বিজ্ঞাপন
এর মধ্যেই ৩ সেপ্টেম্বর জিয়ারাত থেকে ফেরার পথে একটি আধাসামরিক বাহিনীর গাড়িবহরে হামলার ঘটনা ঘটে। পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, এতে এক ডজনের বেশি আধাসামরিক সদস্য নিহত হয়েছেন। বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি বা বিএলএ হামলার দায় স্বীকার করলেও পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা আইএসপিআর ঘটনাটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
বেলুচিস্তানে বাড়ছে সহিংসতার মাত্রা
পাকিস্তানের বিভিন্ন সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর সহিংসতার মাত্রায় বেলুচিস্তান পার্শ্ববর্তী খাইবার পাখতুনখাওয়াকেও ছাড়িয়ে গেছে।
বিজ্ঞাপন
ইসলামাবাদভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাকিস্তান ইনস্টিটিউট ফর কনফ্লিক্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (পিকস) তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের বেশিরভাগ সময় বেলুচিস্তানই পাকিস্তানের সবচেয়ে সহিংসতাপ্রবণ প্রদেশ ছিল।
জুলাইয়ে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। পিকসের হিসাবে, ওই মাসটি ছিল ২০২৬ সালে পাকিস্তানের সবচেয়ে প্রাণঘাতী মাস। শুধু জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহেই বেলুচিস্তানে ২৫টি হামলায় ১০২ জন নিহত হন। প্রদেশটির উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে টিটিপির তৎপরতা বেড়ে যাওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আগস্টে বেলুচিস্তানে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে ১১৫ জন সশস্ত্র যোদ্ধা নিহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে পিকস। একই সময়ে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় ৫৬ জন এবং একীভূত উপজাতীয় জেলাগুলোতে ৩২ জন নিহত হন।
বিজ্ঞাপন
জুনের আগে ছিল ভিন্ন চিত্র
গত জুনের আগে বেলুচিস্তানের ১১টি পশতুন-অধ্যুষিত জেলা বড় ধরনের সশস্ত্র হামলা থেকে প্রায় পুরোপুরি মুক্ত ছিল। জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ঝোব, শেরানি, কিলা সাইফুল্লাহ, লোরালাই, মুসাখাইল, দুকি, বারখান, পিশিন, কিলা আবদুল্লাহ, জিয়ারাত ও হারনাইয়ে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলা নথিভুক্ত হয়নি।
কিন্তু ১০ জুন মোটরসাইকেলে থাকা বন্দুকধারীরা চারটি জেলায় পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালানোর পর পরিস্থিতি বদলে যায়। এরপর থেকে পশতুন-অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে অন্তত ১৩টি সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে।
বিজ্ঞাপন
জুলাইয়ে জিয়ারাতের কাছে একটি বাঁধ প্রকল্পের নিরাপত্তায় থাকা ২৭ পুলিশ সদস্য নিহত হন। এসব হামলার কোনো কোনোটি বিএলএ, আবার কোনোটি টিটিপি বা অন্যান্য বেলুচ সশস্ত্র গোষ্ঠী দায় স্বীকার করেছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
পুলিশ সদস্যদের হত্যার প্রতিবাদে নিহতদের পরিবার ও পশতুন জাতীয়তাবাদী দলগুলো কোয়েটায় তিন দিনের অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। তাদের অভিযোগ ছিল, হামলার শিকার পুলিশ সদস্যদের সহায়তায় যথাসময়ে অতিরিক্ত বাহিনী পাঠানো হয়নি।
বিজ্ঞাপন
টিটিপি-বিএলএর মধ্যে সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন
বেলুচিস্তান নিয়ে কাজ করা নীতিবিশ্লেষক রাফিউল্লাহ কাকার মতে, সাম্প্রতিক পরিবর্তনটি গুরুত্বপূর্ণ এবং তুলনামূলকভাবে নতুন। তার ভাষ্য, বিএলএ তাদের প্রচলিত কর্মকাণ্ডের এলাকার বাইরে হামলা চালানোর সক্ষমতা ও আগ্রহ দেখাচ্ছে, যা সংগঠনটির ভৌগোলিক বিস্তারের ইঙ্গিত দিতে পারে।
একই সঙ্গে টিটিপি ও বিএলএর মধ্যে কোনো ধরনের কৌশলগত সমন্বয় বা সহযোগিতা রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইফতিখার ফিরদৌস দুই গোষ্ঠীর সরাসরি সহযোগিতার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তার মতে, ২০১৯ সাল থেকেই টিটিপি বেলুচিস্তানে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। সংগঠনটির প্রধান নূর ওয়ালি মেহসুদও বেলুচ সশস্ত্র যোদ্ধাদের সঙ্গে জোট গঠনের আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।
এ ক্ষেত্রে বেলুচিস্তানের উত্তরাঞ্চলের এন-৫০ মহাসড়কটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই সড়ক ঝোব ও জিয়ারাতকে কোয়েটার মাধ্যমে খাইবার পাখতুনখাওয়ার দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করেছে। দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানকে টিটিপির ঐতিহাসিক ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বাণিজ্যপথেও বাড়ছে ঝুঁকি
বিজ্ঞাপন
সহিংসতার প্রভাব এখন শুধু নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে সীমাবদ্ধ নেই; বেলুচিস্তানের বাণিজ্য ও পরিবহন খাতও বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে।
ইরান সীমান্তের তাফতান থেকে কোয়েটা পর্যন্ত এন-৪০ এবং কোয়েটা থেকে করাচি পর্যন্ত এন-২৫ মহাসড়ক দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রায় চার মাস ধরে নিরাপত্তাহীনতার কারণে এই দুই মহাসড়কের স্বাভাবিক ব্যবহার ব্যাহত হচ্ছে।
বেলুচিস্তান গুডস ট্রাকস ওনার অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান নির্বাহী সদস্য হাজি আমিন সুমালানি বলেন, নিরাপত্তার কারণে চালকেরা এসব পথে চলাচল করতে ভয় পাচ্ছেন। তার দাবি, এ সময়ে শতাধিক পণ্যবাহী ট্রাকে আগুন দেওয়া হয়েছে। এতে কয়েক কোটি রুপির ক্ষতি হয়েছে এবং দুই চালক নিহত হয়েছেন।
কোয়েটা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মুহাম্মদ আইয়ুব মিরইয়ানি দাবি করেছেন, নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে চেম্বারের প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে।
কেন বাড়ছে হামলা
বিশ্লেষকদের মতে, বেলুচিস্তানের পশতুন এলাকাগুলোতে সহিংসতা বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। কোয়েটাভিত্তিক গবেষক ইমতিয়াজ বেলুচের মতে, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো তাদের প্রচলিত ঘাঁটির বাইরে অভিযান ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনপথগুলো এখন তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে।
উত্তর বেলুচিস্তানের মহাসড়কগুলো প্রদেশের অন্যান্য অনেক সড়কের তুলনায় এতদিন তুলনামূলকভাবে সচল ছিল। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কাছে এই কারণেই অঞ্চলটি এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন তিনি।
নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রহিম নাসার বলেন, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বড় অভিযানের পর অনেক যোদ্ধা বেলুচিস্তানে চলে আসে। এপ্রিলের পর তাদের তৎপরতা আবার বাড়তে শুরু করে এবং জুনে এসে হামলার মাত্রা আরও বেড়ে যায়।
আরও পড়ুন
তবে টিটিপি ও বিএলএর মধ্যে সরাসরি যোগসাজশের বিষয়ে নিশ্চিত নন তিনিও। তার মতে, যে গোষ্ঠী কোনো এলাকায় প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে, তারা সেখানেই হামলা চালাচ্ছে।
বাড়তে পারে স্থানীয় অসন্তোষ
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, কেবল সামরিক অভিযান চালিয়ে বেলুচিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান করা কঠিন হতে পারে। পশতুন অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে আগে থেকেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষ রয়েছে।
সীমান্ত বন্ধ এবং সীমান্তনির্ভর জীবিকার ওপর বিভিন্ন বিধিনিষেধ নিয়েও এসব এলাকায় অতীতে প্রতিবাদ হয়েছে। নতুন করে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা স্থানীয় জনগণের অসন্তোষ আরও গভীর করার ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
ফলে বেলুচিস্তানে সহিংসতার নতুন বিস্তার পাকিস্তান সরকারের জন্য শুধু নিরাপত্তাজনিত সংকট নয়; এর সঙ্গে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও স্থানীয় অর্থনীতির প্রশ্নও জড়িয়ে পড়ছে।








