পেরিম দ্বীপে হুতির উপস্থিতি, বন্ধ হয়ে গেল সৌদির তেল পাইপলাইন

কৌশলগত বাব আল-মান্দেব প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি যোদ্ধাদের উপস্থিতির খবরকে কেন্দ্র করে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই ইরাক থেকে আসা ড্রোন হামলার পর সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) ইয়েমেন সরকারের চারটি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে, হুতি যোদ্ধারা পেরিম দ্বীপে পৌঁছেছে। বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় এই দ্বীপের কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। ফলে সেখানে হুতিদের উপস্থিতি নৌপথটিতে তাদের প্রভাব আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
একই সময়ে সৌদি কর্মকর্তারা দেশটির পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার তথ্য নিশ্চিত করেছেন। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সৌদি তেল আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বাব আল-মান্দেবের ওপর হুতিদের নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী হলে হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীটির প্রভাবের আওতায় চলে যেতে পারে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
সৌদি-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের দুটি সূত্র জানিয়েছে, তাদের বাহিনী পেরিম দ্বীপ থেকে সরে গেছে। একই সময়ে হুতিরা লোহিত সাগর উপকূলের ধুবাব শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। শহরটি পেরিম দ্বীপের ঠিক বিপরীতে অবস্থিত।
এদিকে হুতিদের হামলার আশঙ্কা বাড়তে থাকায় সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে ওয়াশিংটন আপাতত সরাসরি সামরিক পদক্ষেপে যেতে রাজি হয়নি। পরিবর্তে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে সহায়তার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিজ্ঞাপন
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বৃহস্পতিবার অন্তত দুবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফোন করে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়তা চেয়েছেন বলে বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত দুটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে। এর আগে অ্যাক্সিওসও একই তথ্য প্রকাশ করে।
প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনটি হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সৌদি তেল বৈশ্বিক বাজারে পাঠানোর প্রধান বিকল্প পথ। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ও বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়েছে, যা বিশ্বের মোট সরবরাহের প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশ।
সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রের বরাতে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনে একাধিক হামলার পর পাইপলাইনের বিদ্যমান সক্ষমতাও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তবে হামলাটি কারা চালিয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ড্রোনগুলো ইরাক থেকে এসেছে। ইরাকে ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র মিলিশিয়ার উপস্থিতি রয়েছে। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধের পর এখন পর্যন্ত রিয়াদ কোনো পাল্টা হামলা চালায়নি। হামলার নিন্দা জানিয়েছে ইরাক সরকারও।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে। তবে এর ফলে তেল রপ্তানিতে কী ধরনের প্রভাব পড়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) শুক্রবার জানিয়েছে, তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল সরবরাহ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে বাব আল-মান্দেব দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হুতি-ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোর হামলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
চলমান সংঘাতের মধ্যে শুক্রবার তেলের দাম কিছুটা কমলেও সপ্তাহ শেষে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে থাকার পথে রয়েছে। মে মাসের মাঝামাঝির পর প্রথমবারের মতো এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে যাচ্ছে।
এদিকে হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেছেন, সৌদি জাহাজ ছাড়া অন্য সব ধরনের নৌযানের জন্য সামুদ্রিক চলাচল নিরাপদ। তবে সৌদি জাহাজের ওপর আগে ঘোষণা করা নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
ওয়াশিংটন-রিয়াদ যোগাযোগ
বিজ্ঞাপন
সৌদি যুবরাজের অনুরোধ সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক অভিযানে যুক্ত হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে ওয়াশিংটন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
পেরিম দ্বীপে হুতিদের উপস্থিতি, সৌদির গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামোয় হামলা এবং বাব আল-মান্দেব ও হরমুজ—দুই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ঘিরে বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে এর প্রভাব আঞ্চলিক গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে।








