যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আশঙ্কায় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে কানাডা!

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সামরিক হামলার আশঙ্কা বাস্তবে অত্যন্ত কম। তারপরও এমন একটি অভাবনীয় পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে সামরিক প্রস্তুতি ও সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতির পরিকল্পনা করছে কানাডা। দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি জানিয়েছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার সম্পর্ক নতুন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাই সম্ভাব্য সব পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া সরকারের দায়িত্বের অংশ।
বিজ্ঞাপন
সম্প্রতি দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কার্নি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের মতো চরম সম্ভাবনাকেও তার প্রশাসন বিবেচনায় নিয়েছে। তিনি বিষয়টিকে ‘ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এটি কোনো স্বাভাবিক বা প্রত্যাশিত পরিস্থিতি নয়, তবে এমন ঝুঁকির জন্য প্রস্তুতি না নেওয়াও দায়িত্বশীলতার পরিচয় হবে না।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্কনীতি এবং কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ করার বিষয়ে তার বারবার করা মন্তব্যের পর দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন বেড়েছে। তবে ২০২৫ সালে ট্রাম্প বলেছিলেন, কানাডার বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা খুবই কম। রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে তিনি অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের কথা জানিয়েছিলেন। চলতি সপ্তাহেও হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে কানাডার জনগণের স্বার্থ রক্ষায় ট্রাম্পের ভূমিকার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞরাও যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক আগ্রাসনের সম্ভাবনাকে অত্যন্ত ক্ষীণ বলে মনে করছেন। রয়্যাল কানাডিয়ান এয়ার ফোর্সের সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট-জেনারেল ক্রিস্টোফার কোটস ৩৪ বছর সামরিক বাহিনীতে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি জানান, তার পুরো কর্মজীবনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড থেকে কানাডায় সামরিক হামলার সম্ভাবনাকে কখনো বাস্তব পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি।
বিজ্ঞাপন
কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর সদস্য এবং উত্তর আমেরিকার আকাশ ও প্রতিরক্ষা নিরাপত্তায় দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করে। নোরাডের অধীনেও দুই দেশের সামরিক সহযোগিতা রয়েছে। ফলে কোটসের মতে, কোনো ধরনের সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হলেও সেটি সরাসরি সামরিক হামলা দিয়ে শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং সাইবার হামলার মতো তুলনামূলকভাবে গোপন পদ্ধতির আশঙ্কা বেশি বলে তিনি মনে করেন।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তবে বিষয়টি কানাডার সাধারণ মানুষের মধ্যেও কিছুটা উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র আটক করার পর লেজার পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, ৩০ শতাংশের বেশি কানাডীয় মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আগ্রাসনের আশঙ্কা রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
ইতিহাসের দিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সম্পর্ক সবসময় বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল না। কানাডিয়ান ওয়ার মিউজিয়ামের গবেষক টিম ফোরানের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সম্প্রসারণবাদকে মোকাবিলার অভিজ্ঞতা কানাডার রাজনৈতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে দুই দেশের মধ্যে একাধিক সংঘাত হয়েছে। ১৭৭৫ সালে মন্ট্রিয়ল দখল এবং ১৮১২ সালের যুদ্ধ তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান শক্তি ও প্রভাব নিয়ে কানাডায় উদ্বেগ ছিল। গবেষক অ্যান্ড্রু বার্চের মতে, সে সময় কানাডার সেনা কর্মকর্তারা পর্যটকের ছদ্মবেশে সীমান্তবর্তী এলাকায় গিয়ে সড়ক, সেতু ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার তথ্য সংগ্রহ করতেন। তার ভাষায়, সামরিক বাহিনী সম্ভাব্য বিভিন্ন পরিস্থিতির জন্য পরিকল্পনা করে থাকে।
নিউ হেভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক ম্যাথিউ স্মিডট মনে করেন, কানাডার বর্তমান প্রস্তুতি বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কানাডা কতটা ঘনিষ্ঠভাবে কাজ চালিয়ে যাবে, সেটিও দেশটির নেতৃত্বকে নতুন করে ভাবতে হবে। কারণ দীর্ঘদিনের সামরিক অংশীদারিত্বের ফলে যুক্তরাষ্ট্র কানাডার গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অনেক তথ্য সম্পর্কে অবগত।
বিজ্ঞাপন
কানাডার সামরিক বাহিনীর একটি সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতির মডেল অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ করলে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে কানাডার কৌশলগত অবস্থানগুলো ব্যাপক চাপের মুখে পড়তে পারে। এরপর কানাডীয় বাহিনীকে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ বা গেরিলা ধরনের যুদ্ধের দিকে যেতে হতে পারে। পাশাপাশি ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের মতো মিত্রদের কাছ থেকে সহায়তা চাওয়ার বিষয়টিও সেই মডেলে বিবেচনা করা হয়েছে।
এ ধরনের সম্ভাবনা সামনে রেখে কানাডা নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এর অংশ হিসেবে সামরিক বাহিনীর আকার বাড়ানোর পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক স্বল্প-প্রশিক্ষিত নাগরিক সেনা যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় প্রায় তিন লাখ নাগরিক সেনা যুক্ত করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও কানাডায় সামরিক অভিযান চালানো সহজ হবে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ম্যাথিউ স্মিডটের মতে, এমন নির্দেশ দেওয়া হলে অনেক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা পদত্যাগ করতে পারেন। তারা এই ধরনের নির্দেশকে অবৈধ ও অনৈতিক হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন। দুই দেশের সামরিক বাহিনীর সদস্যরা নিয়মিত একসঙ্গে প্রশিক্ষণ নেওয়ায় তাদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্পর্কও রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তারপরও যদি দুই দেশের মধ্যে সামরিক সংঘাতের মতো চরম পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে কানাডার তেল ও খনিজ সম্পদের মতো কৌশলগত সম্পদের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে বলে মনে করেন স্মিডট। একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়ার মতো পদক্ষেপও নেওয়া হতে পারে বলে তার ধারণা।
তবে সবকিছুর পরও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা কানাডার তুলনায় অনেক বেশি হলেও কানাডীয় বাহিনী নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে বলে মনে করেন তিনি। আর কানাডার বর্তমান সামরিক প্রস্তুতিকে বিশেষজ্ঞরা মূলত অত্যন্ত অসম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য ঝুঁকি মূল্যায়ন ও পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবেই দেখছেন।
সূত্র: বিবিসি








