Logo

শেখ হাসিনার দুঃশাসন নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছিলেন নাভি পিল্লাই

profile picture
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
৯ অক্টোবর, ২০২৬, ২২:১৩
শেখ হাসিনার দুঃশাসন নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছিলেন নাভি পিল্লাই
ছবি: সংগৃহীত

শেখ হাসিনার সরকারের আমলে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন জাতিসংঘের তৎকালীন মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার নাভানেথেম নাভি পিল্লাই। বিশেষ করে, ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় বিপুলসংখ্যক আসামির বিচার, হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ এবং মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে ২০১৩ সালে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

একই সময়ে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়ায়ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুসরণের ওপর জোর দিয়েছিলেন এই আইনজীবী ও বিচারক।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নাভি পিল্লাইয়ের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার খবর সামনে আসার পর বাংলাদেশের তৎকালীন সরকারের আমলে মানবাধিকার নিয়ে তাঁর অবস্থান নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার এই মানবাধিকারকর্মী ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন। আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার, নির্যাতনের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং মানবাধিকারের সুরক্ষায় দীর্ঘদিন কাজ করেছেন তিনি।

তবে পিল্লাইয়ের বক্তব্যের তাৎপর্য বুঝতে হলে তাঁর সমালোচনার নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা জরুরি। তাঁর উত্থাপিত প্রশ্নগুলো মূলত বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার, হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগের তদন্ত এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন মেনে চলার সঙ্গে সম্পর্কিত। এসব বক্তব্যকে শেখ হাসিনার পুরো শাসনামল সম্পর্কে তাঁর সামগ্রিক মূল্যায়ন হিসেবে উপস্থাপন করা যথাযথ হবে না।

বিজ্ঞাপন

পিলখানা মামলার বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ

নাভি পিল্লাইয়ের আলোচিত বক্তব্যগুলোর একটি ছিল ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে। ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর ঢাকার একটি বিশেষ আদালত এ মামলায় ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরদিন, ৬ নভেম্বর, পিল্লাই বিচারপ্রক্রিয়া এবং অভিযুক্তদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর) সদর দপ্তরে বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডে ৭৪ জন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা ছিলেন। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে অপরাধের বিচার করতে গিয়ে অভিযুক্তদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে কি না, সেটিও ছিল পিল্লাইয়ের উদ্বেগের বিষয়।

বিজ্ঞাপন

তৎকালীন বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর আপত্তির মধ্যে ছিল বিপুলসংখ্যক আসামিকে একসঙ্গে বিচারের মুখোমুখি করা, পর্যাপ্ত আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ এবং অভিযুক্তদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ। হেফাজতে কয়েকজনের মৃত্যুর খবর এবং নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা প্রমাণ আদালতে ব্যবহারের অভিযোগও তাঁর বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছিল।

পিল্লাই এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, তদন্তের ফল প্রকাশ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা ছিল, গুরুতর অপরাধের বিচার অবশ্যই হতে হবে, তবে সেই বিচার হতে হবে ন্যায়সংগত এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

একাত্তরের অপরাধের বিচার নিয়েও ছিল উদ্বেগ

বিজ্ঞাপন

শেখ হাসিনার সরকারের আমলে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে বিচার না হওয়া এসব অপরাধের বিচার বাংলাদেশের রাজনীতি ও ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

তবে বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রতিরক্ষার সাক্ষীদের নিরাপত্তা এবং মৃত্যুদণ্ডের মতো শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে ন্যায্য বিচারের নিশ্চয়তা ছিল আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন যোগাযোগ ও পর্যবেক্ষণেও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত জাতিসংঘের একটি যোগাযোগে আবদুল কালাম আজাদের অনুপস্থিতিতে বিচার, রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীর পর্যাপ্ততা এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ উল্লেখ করা হয়। তবে এগুলো ছিল প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে উত্থাপিত অভিযোগ ও উদ্বেগ; আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।

বিজ্ঞাপন

এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—১৯৭১ সালের অপরাধের বিচার এবং পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার ছিল পৃথক ঘটনা ও পৃথক বিচারপ্রক্রিয়া। নাভি পিল্লাইয়ের উদ্বেগের কেন্দ্রেও ছিল নির্দিষ্ট মামলাগুলোর ন্যায্যতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি। তাঁর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, অপরাধের বিচার করার সময়ও আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা মেনে চলার প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি জোর দিয়েছিলেন।

মানবাধিকার রক্ষায় দীর্ঘদিনের ভূমিকা

নাভি পিল্লাই দক্ষিণ আফ্রিকার একজন আইনজীবী ও বিচারক। বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবন গড়ে ওঠে। পরে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

তাঁর কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ, নির্যাতন এবং যৌন সহিংসতার বিচার। আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি অভিযুক্তদের ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকার রক্ষাও তাঁর কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬, নাভি পিল্লাই শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার রক্ষায় তাঁর দীর্ঘদিনের ভূমিকা এই স্বীকৃতির কেন্দ্রে রয়েছে।

হাসিনার শাসনামল মূল্যায়নে কেন প্রাসঙ্গিক তাঁর বক্তব্য?

বিজ্ঞাপন

শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামল নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্কের বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে মানবাধিকার, বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতার প্রশ্ন। এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের জন্য বিভিন্ন সময়ের প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, আদালতের নথি এবং স্বাধীন তদন্তের ফলাফল বিবেচনা করা প্রয়োজন।

নাভি পিল্লাইয়ের ২০১৩ সালের বক্তব্য এই বৃহত্তর আলোচনার একটি প্রাসঙ্গিক অংশ। এটি দেখায়, শেখ হাসিনার সরকারের আমলেই বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কিছু বিচারপ্রক্রিয়া ও হেফাজতে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল।

তবে পিল্লাইয়ের বক্তব্যকে শেখ হাসিনার পুরো শাসনামলকে ‘দুঃশাসন’ আখ্যা দেওয়ার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ নেই। তাঁর নথিভুক্ত বক্তব্যের বিষয় ছিল নির্দিষ্ট বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতা, নির্যাতনের অভিযোগের তদন্ত এবং অভিযুক্তদের অধিকার নিশ্চিত করা। অন্যদিকে, শেখ হাসিনার শাসনামলের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি মূল্যায়নে জাতিসংঘের অন্যান্য প্রতিবেদন ও স্বাধীন অনুসন্ধানও গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

সব মিলিয়ে, নাভি পিল্লাইয়ের অবস্থানের তাৎপর্য হলো—কোনো রাষ্ট্রে গুরুতর অপরাধের বিচার যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, সেই বিচারপ্রক্রিয়ায় ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রেরই। বাংলাদেশের তৎকালীন সরকারকে ঘিরে মানবাধিকারবিষয়ক বিতর্কের ইতিহাসে তাঁর এই অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

তথ্য সূত্র : বিবিসি, ওএইচসিআর

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD