Logo

বিশ্বজুড়ে বিক্ষোভের ঝড়, উত্তাল ভারত-যুক্তরাষ্ট্র-ফ্রান্সসহ বহু দেশ

profile picture
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১৬:৩৫
বিশ্বজুড়ে বিক্ষোভের ঝড়, উত্তাল ভারত-যুক্তরাষ্ট্র-ফ্রান্সসহ বহু দেশ
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা দাবিতে রাজপথে নেমেছেন হাজারো মানুষ। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, পর্তুগাল, ইতালি, আলবেনিয়া, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, আর্জেন্টিনা ও তুরস্কে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি। কোথাও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও বাড়িভাড়ার চাপ, কোথাও শিক্ষায় সরকারি বরাদ্দ কমানো, আবার কোথাও পেনশন ও কর্মসংস্থানের সংকট আন্দোলনের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিজ্ঞাপন

দেশভেদে বিক্ষোভের কারণ আলাদা হলেও এসব আন্দোলনে কিছু অভিন্ন ক্ষোভের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি, ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, আবাসন ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি পরিষেবায় ব্যয় সংকোচন এবং ক্ষমতাসীনদের নীতির প্রতি অসন্তোষ মানুষকে রাজপথে নামাচ্ছে। কোনো কোনো দেশে বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় ও শিক্ষা নিয়ে বিক্ষোভ

ফ্রান্সে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পেছনে রয়েছে জ্বালানির দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিক্ষাব্যবস্থায় সরকারি বরাদ্দ কমানোর প্রতিবাদ। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ উন্নত করা এবং পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন।

বিজ্ঞাপন

গত মাসে প্যারিসে ছোট পরিসরে শুরু হওয়া শিক্ষাবিষয়ক আন্দোলন পরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে এবং অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান ব্যাহত হয়।

পরবর্তী সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় ও কমে যাওয়া ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে মানুষের ক্ষোভও আন্দোলনে যুক্ত হয়। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ ফ্রান্স ২৪-কে জানান, ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার প্রতিবাদে দেশজুড়ে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। শুধু প্যারিসেই রাস্তায় নামেন প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ।

প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়েও দেশটিতে বিতর্ক চলছে। ফ্রান্সের সংবিধান অনুযায়ী, তিনি আরেক মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। ফলে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারের নীতি নিয়ে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে।

বিজ্ঞাপন

বেলজিয়ামে ব্যয় সংকোচনের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা

বেলজিয়ামে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি খাতে ব্যয় কমানোর নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। উচ্চশিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নিবন্ধন ফি বাড়ানোর আশঙ্কায় শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদে নামেন। পরে আন্দোলনটি বৃহত্তর অসন্তোষে রূপ নেয়।

১২ অক্টোবর ব্রাসেলসে জাতীয় ধর্মঘট চলাকালে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। ব্রাসেলস ও লিয়েজেও বিক্ষোভ ঘিরে উত্তেজনা ছড়ায়।

বিজ্ঞাপন

বেলজিয়ামের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বার্নার্ড কুইন্টিন বিক্ষোভকারীদের কর্মকাণ্ডকে ‘সমাজকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত, পরিকল্পিত ও বারবার ঘটানো সহিংসতা’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বিক্ষোভকারীদের ‘দাঙ্গাকারী’ বলেও উল্লেখ করেন।

পর্তুগালে বাড়িভাড়া ও আবাসন ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ

পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি এবং সাশ্রয়ী আবাসনের অভাবের প্রতিবাদে হাজারো মানুষ মিছিল করেছেন।

বিজ্ঞাপন

২০১৭ সালের পর থেকে লিসবনসহ দেশটির অনেক শহরে আবাসিক সম্পত্তির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। নতুন চুক্তিতে বাড়িভাড়াও প্রায় একই হারে বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন তরুণ চাকরিজীবী ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো। অনেকের জন্য বাড়ি কেনা তো দূরের কথা, ভাড়া বাসায় থাকাও ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

ফ্রান্সের আন্দোলনের সঙ্গে পর্তুগালের বিক্ষোভের মূল পার্থক্য হলো, সেখানে প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মজুরি, আবাসন এবং পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় মেটানোর সামর্থ্য।

বিজ্ঞাপন

ইতালিতে কমছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা

ইতালিতেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, স্থবির মজুরি এবং ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার প্রতিবাদে মানুষ রাজপথে নেমেছেন। মিলানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।

ফ্রান্সের তুলনায় ইতালিতে বিক্ষোভের ব্যাপ্তি ছোট হলেও মূল্যস্ফীতি ও আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের অসামঞ্জস্য নিয়ে মানুষের ক্ষোভ বাড়ার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে এসব আন্দোলনে।

বিজ্ঞাপন

আলবেনিয়ায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, সংঘর্ষ

আলবেনিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের দুরবস্থা, উচ্চশিক্ষার ব্যয়, আর্থিক সহায়তার অভাব এবং স্নাতক হওয়ার পর কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ বাড়ছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

১৩ অক্টোবর রাজধানী তিরানায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাইরে বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীরা ভবন লক্ষ্য করে ইট ও কংক্রিটের টুকরা ছুড়লে পুলিশ অভিযান চালায়।

বিজ্ঞাপন

পরে আন্দোলনকারীদের দাবির পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। এতে বৈষম্য, বেকারত্ব এবং ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান কমানোর বিষয়গুলোও যুক্ত হয়। স্নাতক হওয়ার পর কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে তরুণদের উদ্বেগ সরকারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।

ভারতে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিক্ষোভ

ভারতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় পর্যালোচনা বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ করছে বিরোধী দলগুলো। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামের একটি নতুন ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক গোষ্ঠী।

বিদেশে শিক্ষিত জনসংযোগ পেশাজীবীর নেতৃত্বে গঠিত গোষ্ঠীটির কয়েকজন সদস্য কংগ্রেস ও দলটির নেতা রাহুল গান্ধীর প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়েছেন। এর আগে মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা এনইইটি-র প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে আন্দোলনেও অংশ নিয়েছিল গোষ্ঠীটি।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ওই বিতর্কের পর কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। তবে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন।

যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পবিরোধী ‘নো কিংস’ সমাবেশ

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরোধিতায় ‘নো কিংস’ নেটওয়ার্কের উদ্যোগে বিভিন্ন শহর ও জনপদে সমাবেশ হয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে আগাম ভোট দিতে মানুষকে উৎসাহিত করাও এসব কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য।

আয়োজকেরা সমাবেশগুলোকে দলনিরপেক্ষ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি ও ক্ষমতা প্রয়োগের ধরন নিয়ে অসন্তোষ এসব কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রেসিডেন্টের নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তুষ্ট মানুষের দীর্ঘদিনের প্রতিবাদের ধারাবাহিকতা থেকেও আন্দোলনগুলো শক্তি পাচ্ছে।

আর্জেন্টিনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বরাদ্দ কমানো নিয়ে বিক্ষোভ

আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এইরেসে উচ্চশিক্ষায় সরকারি ব্যয় কমানোর নীতির প্রতিবাদে হাজারো শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয়কর্মী, ট্রেড ইউনিয়ন সদস্য ও বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী বিক্ষোভ করেছেন।

সংসদ ভবনের বাইরে মূল বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও সেখান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া কয়েকজন মুখোশধারী বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে পাথর ও অন্যান্য বস্তু ছুড়লে সংঘর্ষ বাধে।

আরও পড়ুন

২০২৩ সালের শেষ দিকে প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ক্ষমতায় আসার পর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষায় অর্থায়ন নিয়ে এটি পঞ্চম বড় বিক্ষোভ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য আরও অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে ২০২৫ সালের একটি আইন কার্যকর করার নির্দেশ দিয়ে একাধিকবার রায় দিয়েছেন আদালত। তবে বাজেট কমানোর নীতি নিয়ে সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরোধ অব্যাহত রয়েছে।

তুরস্কে পেনশন নিয়ে ক্ষোভ, অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তার আত্মহত্যা

তুরস্কে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মধ্যে অপর্যাপ্ত পেনশনের প্রতিবাদে গত মাসে বিক্ষোভ করেছেন অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও শ্রমিক সংগঠনের সদস্যরা। রাজধানী আঙ্কারায় সাংবিধানিক আদালতের সামনে জড়ো হয়ে পেনশনভোগীরা মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকা এবং পরিবারের মৌলিক ব্যয় মেটানোর অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানান।

এ সময় ৬০ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা আলি সেকেরোগলু নিজের আর্থিক দুরবস্থা ও দুই বেকার ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেন। তুরস্কের জাতীয় পতাকা গায়ে জড়িয়ে ‘অর্থের জন্য নয়, আমাদের সম্মানের জন্য’ লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে তিনি আত্মহত্যা করেন।

মর্মান্তিক এ ঘটনা দেশটিতে পেনশনভোগীদের আর্থিক সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানোর অসুবিধাকে সামনে এনেছে।

জীবনযাত্রার ব্যয়ই কি বিশ্বজুড়ে ক্ষোভের প্রধান কারণ?

বিভিন্ন দেশের আন্দোলনে স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুর পাশাপাশি একটি সাধারণ সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—মানুষের আয় বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। কোথাও আবাসন ও বাড়িভাড়া, কোথাও শিক্ষার খরচ, আবার কোথাও পেনশন ও সরকারি পরিষেবায় বরাদ্দ কমানো অসন্তোষ বাড়াচ্ছে।

ফ্রান্স ও বেলজিয়ামে বিক্ষোভ সংঘর্ষে গড়িয়েছে। আলবেনিয়ায় শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ সরকারের ওপর চাপ তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পবিরোধী সমাবেশ মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক গুরুত্ব পাচ্ছে। অন্যদিকে, আর্জেন্টিনা ও তুরস্কের ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, শিক্ষা এবং অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তাও জনঅসন্তোষের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।

সব মিলিয়ে, বিভিন্ন দেশের আন্দোলনের কারণ এক না হলেও জীবনযাত্রার ব্যয়, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সরকারি নীতির প্রতি অসন্তোষ বিশ্বজুড়ে বিক্ষোভের অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।

সূত্র: এনডিটিভি

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD