জ্বালানি সংকটে দেশে আবারও ফিরছে অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থা

দেশে আবারও অনলাইন ক্লাস চালুর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে—এমন আলোচনা নতুন করে সামনে আসছে জ্বালানি সংকট, বিদ্যুৎ ঘাটতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখতে বিকল্প হিসেবে অনলাইন পদ্ধতির দিকে ঝুঁকতে পারে সরকার।
বিজ্ঞাপন
বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, ডলার সংকট এবং আমদানি ব্যয়ের চাপের কারণে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক এলাকায় লোডশেডিং বেড়েছে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলছে জনজীবন ও উৎপাদন খাতে।
এই পরিস্থিতি শুধু শিল্প খাতেই নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। নিয়মিত বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক স্কুল-কলেজে ক্লাস নেওয়া ব্যাহত হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো ইতোমধ্যে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। অতীতে মহামারির সময় যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে দ্রুত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম সক্রিয় করার সক্ষমতা এখন আগের চেয়ে বেশি।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, প্রয়োজনে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ধাপে ধাপে অনলাইন ক্লাস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি টেলিভিশনভিত্তিক ক্লাস সম্প্রচারের বিষয়টিও আবার সক্রিয় করার চিন্তা চলছে, যাতে ইন্টারনেট সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীরাও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
‘ব্লেন্ডেড’ শিক্ষার দিকে ঝুঁকছে সরকার : এদিকে মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সচিবালয়ে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন জানান, দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে অনলাইন ও অফলাইনের সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, “অনলাইন-অফলাইন সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা চালুর চিন্তা করা হচ্ছে। বিষয়টি শিগগিরই মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থাপন করা হতে পারে।”
শিক্ষামন্ত্রী জানান, মহানগর এলাকায় তীব্র যানজট, জ্বালানি সংকট এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব মোকাবিলায় বিকল্প ব্যবস্থাও বিবেচনায় রয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস চালু, বৈদ্যুতিক বাস, মেট্রোরেল এবং সৌরশক্তিচালিত পরিবহন ব্যবস্থার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
অনলাইন ক্লাস বাস্তবায়নে প্রযুক্তির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে গুগল-এর বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম যেমন গুগল মিট ও ক্লাসরুম ইতোমধ্যেই দেশে বহুল ব্যবহৃত। এছাড়া জুম ও মাইক্রোসফট টিম-এর মতো প্ল্যাটফর্মও ব্যবহৃত হচ্ছে।
তবে প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থায় বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। অনেক শিক্ষার্থী এখনো স্মার্টফোন, ল্যাপটপ কিংবা নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
অনলাইন ক্লাস নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। শহরের অনেক শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসে অভ্যস্ত হলেও গ্রামে এখনো এটি পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
বিজ্ঞাপন
অভিভাবকদের অভিযোগ, অনলাইন ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন, পাশাপাশি অতিরিক্ত ইন্টারনেট খরচও একটি বড় চাপ। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা বলছে, সরাসরি ক্লাসের মতো শেখার পরিবেশ অনলাইনে পাওয়া যায় না।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পুরোপুরি অনলাইনে নির্ভর না করে ‘হাইব্রিড’ পদ্ধতি (অনলাইন ও অফলাইন মিলিয়ে) চালু করা হলে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। এতে একদিকে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হবে না, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশও কিছুটা বজায় থাকবে।
বিজ্ঞাপন
শিক্ষকরা বলছেন, আগের তুলনায় এখন তারা অনলাইন ক্লাস নিতে বেশি দক্ষ। তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি কার্যকর রাখতে হলে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে নিশ্চিতভাবে অনলাইন ক্লাস চালু হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। তবে জ্বালানি সংকট, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি এবং শিল্পখাতের চাপ বিবেচনায় রেখে সরকার বিকল্প পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখছে।
বিজ্ঞাপন
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের শিক্ষা ব্যবস্থা হবে প্রযুক্তিনির্ভর ও নমনীয়। তাই অনলাইন ক্লাস শুধু সংকটকালীন সমাধান নয়, বরং একটি স্থায়ী সহায়ক মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
জ্বালানি সংকট, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার প্রেক্ষাপটে অনলাইন ক্লাস চালুর আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। শিক্ষা ও অর্থনীতি—দুই খাতেই চাপ বাড়ায় সরকারকে হয়তো আবারও ডিজিটাল ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে হতে পারে।








