Logo

হাদি হত্যা : মমতার মন্তব্যে তোলপাড়, আসামি ফেরাতে তৎপরতা

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৪ জুন, ২০২৬, ১১:৩৩
হাদি হত্যা : মমতার মন্তব্যে তোলপাড়, আসামি ফেরাতে তৎপরতা
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে আলোচিত শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলাকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। এক জনসভায় তিনি বলেন, “বাংলাদেশে কাকে দিয়ে খুন করানো হয়েছিল, সবই জানি।” তার এই বক্তব্যের পর মামলাটির বিভিন্ন দিক আবারও সামনে চলে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

শুরু থেকেই ইনকিলাব মঞ্চ দাবি করে আসছে, দেশীয় একটি চক্রের সহযোগিতায় ভারতীয় আধিপত্যবাদী শক্তি শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যার সঙ্গে জড়িত। মমতার সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর সেই দাবি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।

বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে ইনকিলাব মঞ্চের নেতারা দাবি করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে হত্যাকাণ্ডের পেছনে এমন কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে, যার পরিচয় প্রকাশ পেলে দেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

সংগঠনটির মতে, হাদিকে কেবল আওয়ামী লীগবিরোধী অবস্থানের কারণে হত্যা করা হয়েছে—এমন ধারণা যথেষ্ট নয়। হত্যাকাণ্ডে ভারতের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, সেটিও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাদের অভিযোগ, ঘটনার পর সীমান্ত সিল করার প্রয়োজন থাকলেও তৎকালীন সরকার রহস্যজনকভাবে তা করতে ব্যর্থ হয়।

মামলাটি প্রথমে থানা পুলিশ ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তদন্ত করলেও বর্তমানে অধিকতর তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। মমতার বক্তব্য তদন্তের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটিও যাচাই করা হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

বিজ্ঞাপন

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর মূল অভিযুক্তরা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মেঘালয় হয়ে কলকাতায় আশ্রয় নেয়। পরে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্পেশাল টাস্কফোর্স (এসটিএফ) তাদের গ্রেপ্তার করে। তদন্তকারীদের ধারণা, এই তিন আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনা গেলে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের বহু অজানা তথ্য সামনে আসতে পারে।

আসামিদের প্রত্যর্পণের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। প্রয়োজন হলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আবারও যোগাযোগ করা হবে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদি। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি নির্বাচনী প্রচারণাও চালাচ্ছিলেন। এর মধ্যেই গত বছরের ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে মোটরসাইকেল আরোহী দুর্বৃত্তদের গুলিতে আহত হন তিনি। পরে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলে ১৮ ডিসেম্বর রাতে তার মৃত্যু হয়।

বিজ্ঞাপন

ঘটনার পর দায়ের করা মামলাটি পরবর্তীতে হত্যা মামলায় রূপ নেয়। চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি ডিবি ১৭ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। সেখানে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জেরেই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়।

তবে অভিযোগপত্রে অসন্তোষ প্রকাশ করে মামলার বাদী আদালতে নারাজি আবেদন করলে আদালত অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিয়ে মামলাটি সিআইডির কাছে হস্তান্তর করেন।

বিজ্ঞাপন

বর্তমানে অভিযোগপত্রভুক্ত ১৭ আসামির মধ্যে ১১ জন কারাগারে রয়েছেন এবং ছয়জন পলাতক। পলাতকদের মধ্যে প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীর হোসেনও রয়েছেন।

তদন্তে ডিবি জানিয়েছিল, হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেন ফয়সাল ও আলমগীর। মোটরসাইকেলে করে তারা হাদিকে অনুসরণ করেন এবং সুযোগ বুঝে গুলি চালান। পরবর্তীতে বিভিন্ন ব্যক্তি তাদের পালাতে ও সীমান্ত অতিক্রম করতে সহায়তা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ডিবির অভিযোগপত্রে উল্লেখ ছিল, নতুন তথ্য বা অন্য কারও সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।

এদিকে মামলার অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ ইতোমধ্যে ১৪ বার পিছিয়েছে। সর্বশেষ নির্ধারিত তারিখেও প্রতিবেদন জমা না হওয়ায় আদালত আগামী ৭ জুন নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান জানিয়েছেন, অধিকতর তদন্তে নতুন তথ্যের ভিত্তিতে মো. রুবেল ও মাজেদুল নামে আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও দিয়েছেন। এছাড়া মোটরসাইকেল সরবরাহকারী মইনুদ্দিন শুভকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তবে মূল আসামি ফয়সাল ও আলমগীরকে দেশে ফিরিয়ে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় গ্রেপ্তার আসামিদের ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে বলেও জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য তদন্তে বিবেচনায় নেওয়া হবে কি না—এ প্রশ্নে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বক্তব্যটি মামলার সঙ্গে কতটা প্রাসঙ্গিক, তা সিআইডি যাচাই করবে। নতুন কোনো তথ্যের সূত্র পাওয়া গেলে সেটিও তদন্তে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

সিআইডির ভারপ্রাপ্ত প্রধান ডিআইজি আলি আকবর খান বলেন, তদন্ত চলমান রয়েছে। যে কোনো বক্তব্য বা তথ্য মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত হলে তা গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা হবে। পাশাপাশি প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় গ্রেপ্তার আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, হাদি হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। ভারতে গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে কাজ করছে। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।

এদিকে হাদি হত্যার বিচার, পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনা এবং ঘটনার পেছনের দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র উদঘাটনের দাবিতে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ইনকিলাব মঞ্চ। সংগঠনটি মশাল মিছিল ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করবে বলে জানিয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বলেন, হত্যাকাণ্ডের বিচার বাধাগ্রস্ত করতে বিভিন্ন সময়ে নানা অপপ্রচার চালানো হয়েছে। যারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আড়াল করার চেষ্টা করেছে কিংবা পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছে, তাদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে।

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য থেকে তাদের ধারণা আরও জোরালো হয়েছে যে, হত্যাকাণ্ডের পেছনে এমন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে, যার পরিচয় প্রকাশ পেলে দেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে।

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD