Logo

মামলার পরও ধরাছোঁয়ার বাইরে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
চট্টগ্রাম
১৬ জুন, ২০২৬, ১২:৫৪
মামলার পরও ধরাছোঁয়ার বাইরে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা
ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রামে জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে মারধর ও হেনস্তার ঘটনায় মামলা দায়ের হলেও অভিযুক্ত দুই পুলিশ সদস্য এখনো গ্রেপ্তার হননি। একই সঙ্গে ঘটনার নির্দেশদাতা হিসেবে অভিযোগ ওঠা খুলশী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমানের ভূমিকা নিয়েও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

বিজ্ঞাপন

আইনজীবীদের মতে, কোনো ফৌজদারি মামলায় অভিযোগ উঠলে সাধারণত তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রয়োজন হলে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করা হয়, অথবা অভিযুক্ত ব্যক্তি আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইতে পারেন। তবে নাঈম হাসানকে মারধর, অপহরণের চেষ্টা ও বেআইনিভাবে আটকে রাখার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় এখন পর্যন্ত সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ হতে দেখা যায়নি।

অভিযোগ রয়েছে, অভিযুক্তরা পুলিশ বাহিনীর সদস্য হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে গড়িমসি করা হচ্ছে। বিষয়টি বিভাগীয় তদন্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা হচ্ছে বলেও সমালোচনা রয়েছে। যদিও ভুক্তভোগীর অভিযোগ অনুযায়ী, এটি কেবল শৃঙ্খলাভঙ্গ নয়, বরং গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ।

বিজ্ঞাপন

ঘটনার সূত্রপাত গত শুক্রবার রাতে। প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচ শেষে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ফিরে বিমানবন্দর থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় বাসায় যাচ্ছিলেন নাঈম হাসান। এ সময় নগরের লালখান বাজার ফ্লাইওভারের মুখে তার বহনকারী সিএনজিটি থামানো হয়।

জানা গেছে, বিমানবন্দরকেন্দ্রিক স্বর্ণ চোরাচালানের একটি তথ্যের ভিত্তিতে ওই এলাকায় চেকপোস্ট বসানো হয়েছিল। তৎকালীন ওসি আরিফুর রহমানের নির্দেশে এসআই শফিকুল ইসলামসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য ও সোর্স অভিযানে অংশ নেন। একটি তথ্যের ভিত্তিতে নাঈমের সিএনজিটি থামানো হলে তাকে প্রথমে সন্দেহভাজন হিসেবে দেখা হয়।

বিজ্ঞাপন

নাঈমের অভিযোগ, ডিবি পরিচয়ে তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে জোরপূর্বক পুলিশের গাড়িতে তোলার চেষ্টা করা হয়। এতে বাধা দিলে তাকে মারধর করা হয়। উপস্থিত লোকজন তাকে জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে শনাক্ত করলেও পুলিশ সদস্যরা তা আমলে নেননি। তিনি দাবি করেন, এক পর্যায়ে তাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

তার অভিযোগ, থানায় নেওয়ার পরও পরিচয়পত্র দেখানো এবং নিজের পরিচয় দেওয়ার পর তাকে হয়রানি করা হয়। পরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি তামিম ইকবাল ও পরিচালক ইসরাফিল খসরুর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা পুলিশের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

ঘটনার পরদিন নাঈমের ভাই সাব্বির আলম বাদী হয়ে খুলশী থানায় মামলা করেন। মামলায় এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেল এবং সোর্স সোহেলকে আসামি করা হয়। অভিযোগে মারধর, অপহরণের চেষ্টা ও বেআইনি আটকে রাখার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

মামলার পর সোর্স সোহেলকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। এছাড়া এসআই শফিকুল ইসলাম ও কনস্টেবল রাসেলকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়নি।

এদিকে ওসি আরিফুর রহমানের বিরুদ্ধে নাঈম ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় নেওয়ার নির্দেশ এবং পরবর্তী হয়রানিতে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে। যদিও তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, অভিযানের বিষয়ে তাকে আগে থেকে জানানো হয়নি। পরে এসআই শফিকুল ইসলাম নাঈমকে থানায় নিয়ে এলে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। অনুমতি ছাড়া অভিযানে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

বিজ্ঞাপন

ঘটনার পর সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী নাঈমের বাসায় গিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং বলেন, অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা অপেশাদার আচরণ করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে এবং একজনকে আটক করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, মামলার পর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অভিযুক্তদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং বিভাগীয় ও আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান খান বলেন, কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ উঠলে তাকে সাধারণ নাগরিকের মতোই আইনের মুখোমুখি হতে হবে। বিভাগীয় তদন্ত কখনোই ফৌজদারি মামলার বিকল্প হতে পারে না।

তিনি আরও বলেন, অভিযুক্তদের একজনকে আটক করা হলেও অন্যরা এখনো বাইরে থাকায় জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তদন্তে ওসির সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাকেও আইনের আওতায় আনতে হবে। শুধু দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া শাস্তি নয়, এটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা মাত্র। অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ জরুরি।

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD