Logo

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি কতটা ক্ষমতাবান, সংবিধান কী বলে?

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১০ আগস্ট, ২০২৬, ১৪:৪০
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি কতটা ক্ষমতাবান, সংবিধান কী বলে?
বঙ্গভবন | ফাইল ছবি

বাংলাদেশে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন—এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি পদটির সাংবিধানিক ক্ষমতা, দায়িত্ব এবং বাস্তবে এই পদ কতটা প্রভাবশালী—তা নিয়েও নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান। সাধারণ পরিস্থিতিতে পদটির ক্ষমতা অনেকটাই আনুষ্ঠানিক। তবে বিশেষ রাজনৈতিক বা সাংবিধানিক সংকট তৈরি হলে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

এ কারণেই রাষ্ট্রপতি পদকে একদিকে সীমিত ক্ষমতার, অন্যদিকে বিশেষ পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করেন বিশ্লেষকরা।

সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কতটুকু

বিজ্ঞাপন

১৯৯১ সালের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তিত হয়। এই ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা মূলত প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে থাকে। রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

এ ছাড়া অন্যান্য সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়।

বিজ্ঞাপন

এর আওতায় রয়েছে সংসদ আহ্বান, স্থগিত বা ভেঙে দেওয়া, সংসদে পাস হওয়া বিলে সম্মতি প্রদান, জরুরি অবস্থা ঘোষণা, রাষ্ট্রদূত নিয়োগ, যুদ্ধ ঘোষণা, শান্তিচুক্তি অনুমোদন এবং ক্ষমা প্রদর্শনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ কাগজে-কলমে এসব ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির নামে থাকলেও সংসদীয় ব্যবস্থায় বাস্তবে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শই এসব সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মুখ্য হয়ে ওঠে।

সংবিধানে এমন ব্যবস্থাও রয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে কোনো পরামর্শ দিয়েছেন কি না এবং দিয়ে থাকলে সেটি কী ছিল—এ বিষয়ে কোনো আদালত তদন্ত করতে পারবে না।

বিজ্ঞাপন

তাহলে রাষ্ট্রপতি নিয়ে এত আলোচনা কেন

সাধারণ সময়ে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত হলেও সাংবিধানিক বা রাজনৈতিক সংকটের সময় পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকায় কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। বিশেষ করে সংসদ, সরকার বা রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হলে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা আলোচনায় আসে।

বিজ্ঞাপন

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদের মতে, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির স্বাধীন ক্ষমতা খুবই সীমিত। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে বাস্তব রাজনৈতিক শক্তির সমর্থন থাকলে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদের মতে, আইনগতভাবে রাষ্ট্রপতি একটি নিরপেক্ষ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা থাকলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই স্বাধীনতা অনেক সময় সীমিত হয়ে পড়ে।

বিশেষ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একাধিকবার রাষ্ট্রপতি গুরুত্বপূর্ণ সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন।

রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে শুধু সংবিধানের লিখিত বিধান নয়, বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তির অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

১৯৯৬ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস ও সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিমের মধ্যে বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করেছিল। দুই ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যায় যে দেশে সেনা অভ্যুত্থানের মতো অবস্থা তৈরি হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

পরবর্তীতে সেনাপ্রধানের উদ্যোগ ব্যর্থ হয় এবং তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে আটক করা হয়।

এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকটের সময় রাষ্ট্রপতির অবস্থান কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের ভূমিকা

বিজ্ঞাপন

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকা সাবেক প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি একটি বিতর্কিত আইন প্রণয়নে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এ নিয়ে তৎকালীন সরকার ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়।

পরবর্তী সময়ে তার নিরপেক্ষ অবস্থানের কারণে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আলোচিত রাষ্ট্রপতিদের একজন হিসেবে পরিচিতি পান।

বিজ্ঞাপন

সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা সীমিত হলেও তার পাঁচ বছরের মেয়াদে সাহাবুদ্দীন আহমদের ভূমিকা রাষ্ট্রপতি পদটির নিরপেক্ষতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে।

বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগ

২০০২ সালে বিএনপি সরকারের সময় রাষ্ট্রপতি হন এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। তবে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই তার সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

আরও পড়ুন

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে তার মাজারে শ্রদ্ধা জানাতে না যাওয়া এবং জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে উল্লেখ না করার বিষয়টি নিয়ে দলটির সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়।

একপর্যায়ে বিএনপির পক্ষ থেকেই তাকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর চাপ দেওয়া হয়। অভিশংসনের আলোচনাও সামনে এসেছিল। শেষ পর্যন্ত বদরুদ্দোজা চৌধুরী নিজেই পদত্যাগ করেন।

এই ঘটনাও দেখিয়েছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হলেও দায়িত্ব গ্রহণের পর রাষ্ট্রপতি ও রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হলে পরিস্থিতি কতটা জটিল হতে পারে।

২০০৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংকট

২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ চরমে উঠলে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন।

কয়েক মাস তিনি রাষ্ট্রপতি এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা—দুই দায়িত্ব পালন করেন। তার অধীনে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল।

পরে রাজনৈতিক ও সামরিক চাপের মধ্যে তাকে ওই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে হয়। এরপর ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রায় দুই বছর রাষ্ট্র পরিচালনা করে।

এই অধ্যায়কে বাংলাদেশের ইতিহাসে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতার সবচেয়ে আলোচিত প্রয়োগগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ব্যক্তিত্বের ওপরও নির্ভর করে

বিশ্লেষকদের মতে, একই সাংবিধানিক পদে থেকেও ভিন্ন রাষ্ট্রপতির ভূমিকা একরকম হয়নি। রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং তাকে ঘিরে থাকা রাজনৈতিক বাস্তবতা—সবকিছু মিলিয়ে তার কার্যকর ভূমিকা নির্ধারিত হয়।

রাষ্ট্রপতি পদটি দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতাসীন দল সাধারণত নিজেদের পছন্দের বা আস্থাভাজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত করে থাকে।

ফলে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক নিরপেক্ষতা ও বাস্তব রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে।

একসময় রাষ্ট্রপতিই ছিলেন রাষ্ট্রের মূল ক্ষমতাধর

বাংলাদেশের ইতিহাসে রাষ্ট্রপতি পদ সবসময় আনুষ্ঠানিক ছিল না। বরং দেশের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে এই পদের ক্ষমতাতেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।

স্বাধীনতার পর মুজিবনগর সরকারের সময় রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা কার্যকর ছিল। পরে ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা চালু করা হয়।

আরও পড়ুন

কয়েক বছর সংসদীয় ব্যবস্থা চলার পর ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে আবার রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা চালু করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি হন এবং রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়।

পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলেও রাষ্ট্রপতি পদেই রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল।

১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদ সরকারের পতনের পর নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদ সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৯১ সালে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।

এর পর থেকেই রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত হয়ে যায় এবং প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় চলে আসে।

রাষ্ট্রপতি পদ তাই ‘ক্ষমতাহীন’ও নয়, ‘সর্বময়’ও নয়

বাংলাদেশের বর্তমান সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান হলেও দৈনন্দিন রাষ্ট্র পরিচালনায় তার স্বাধীন ক্ষমতা সীমিত।

প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির স্বাধীন ভূমিকা রয়েছে। অন্যদিকে অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের সময় তাকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুসরণ করতে হয়।

তবে রাজনৈতিক সংকট, সাংবিধানিক শূন্যতা কিংবা অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির পদ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন একাধিক দৃষ্টান্তও রয়েছে।

এই কারণে রাষ্ট্রপতি পদকে শুধু আনুষ্ঠানিক পদ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। সংবিধানের লিখিত ক্ষমতার পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত অবস্থান—সবকিছুর ওপর নির্ভর করে এই পদের কার্যকর প্রভাব।

পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হবেন—এ নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা যত এগোবে, ততই সামনে আসবে রাষ্ট্রপতি পদটির সাংবিধানিক সীমা, নিরপেক্ষতা এবং বাস্তব ক্ষমতা নিয়ে পুরোনো প্রশ্নগুলোও।

তথ্য সূত্র: বিবিসি বাংলা

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD