Logo

পূর্বাচল ডিপোতে যাচ্ছে শত শত বাস, মহাখালীতে কমছে যানজট

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১৫:০৭
পূর্বাচল ডিপোতে যাচ্ছে শত শত বাস, মহাখালীতে কমছে যানজট
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর মহাখালী বাসটার্মিনাল ও আশপাশের সড়কে দীর্ঘদিনের যানজট কমাতে পূর্বাচলে চালু করা অস্থায়ী বাস ডিপো এবার কার্যকর ফল দিতে শুরু করেছে। দূরপাল্লার অনেক বাস মহাখালীতে দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে না থেকে পূর্বাচলের ৩ নম্বর সেক্টরের গুতিয়াব এলাকার ডিপোতে অবস্থান করছে। পরিবহন মালিক, চালক ও শ্রমিকদের অংশগ্রহণ বাড়ায় ধীরে ধীরে সফল হচ্ছে সরকারের এই উদ্যোগ।

বিজ্ঞাপন

মহাখালী আন্তঃজেলা বাসটার্মিনাল ১৯৮৪ সালে চালু হওয়ার পর থেকে দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার বাস চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। টার্মিনালটিতে প্রায় ২০০টি বাস রাখার সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে এর বাইরে আশপাশের সড়কেও বিপুলসংখ্যক বাস দাঁড়িয়ে থাকত। এতে নিয়মিত সৃষ্টি হতো তীব্র যানজট।

এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলতি বছরের ১৫ জুলাই মহাখালী থেকে দূরপাল্লার বাস সরিয়ে পূর্বাচলের অস্থায়ী ডিপোতে রাখার কার্যক্রম শুরু হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, যেসব বাসের ট্রিপের সময় এখনো কয়েক ঘণ্টা বাকি, সেগুলো আগে পূর্বাচল ডিপোতে থাকবে। নির্ধারিত সময়ের কাছাকাছি হলে সিরিয়াল অনুযায়ী বাসগুলো মহাখালী টার্মিনালে গিয়ে যাত্রী নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যাবে।

তবে কার্যক্রম শুরুর পর প্রথম দেড় মাসে আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে ডিপোতে চালক ও পরিবহনকর্মীদের জন্য বিশ্রামাগার, গোসল ও টয়লেটের ব্যবস্থা, খাবারের সুবিধা এবং নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। পাশাপাশি ট্রাফিক পুলিশের তৎপরতাও বাড়ানো হয়। এরপর গত মাস থেকে ডিপোতে বাসের চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ১৫০ থেকে ২০০টি বাস পূর্বাচল ডিপোতে আসছে। বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী সাথী এন্টারপ্রাইজ, জমজম ট্রাভেলস, শাহ ফতেআলী, এনা, কাজী পরিবহন, শ্যামলী বাংলা, পাহাড়ি ট্রাভেলস, বিলাস এসি, নাহিদ এন্টারপ্রাইজ, বিনিময়, ইকবাল পরিবহন, সাভার পরিবহন লিমিটেড, দিশারী পরিবহন সার্ভিস, সৌখিন সিটিং সার্ভিস, গ্রীন বাংলা এসি সার্ভিস, হাজী ট্রাভেল, পিংকি পরিবহনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বাস সেখানে অবস্থান করছে।

ডিপোর ভেতরে শুধু বাস রাখার ব্যবস্থাই নয়, রয়েছে বিভিন্ন ধরনের মেরামত সুবিধাও। বডি, ইঞ্জিন, রং, ওয়্যারিং, পাত ও গ্লাসের কাজের জন্য আলাদা ওয়ার্কশপ চালু রয়েছে। ফলে একদিকে বাসগুলো অপেক্ষমাণ অবস্থায় থাকতে পারছে, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় মেরামতের কাজও করা যাচ্ছে।

স্থানীয় চায়ের দোকানি হিরণ মিয়া বলেন, ‘ডিপোর পার্শ্ববর্তী এলাকায় আমার বাড়ি। এটি উদ্বোধনের সময় থেকেই এখানে আমি দোকানদারি করছি। প্রথম দিকে এক থেকে দেড়মাস অল্প কিছু গাড়ি এখানে আসতো। তবে সেপ্টেম্বরে গাড়ি যাতায়াতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এখন ডিপো পুরোদমে জমজমাট। আমার বেচাবিক্রিও ভালো হচ্ছে।’

বিজ্ঞাপন

শাহ ফতেআলী এন্টারপ্রাইজের চালক রানু হোসেন বলেন, ‘প্রথমদিকে এখানে এসে ভালো লাগতো না। গোসলখানা, টয়লেটসহ খাবারের সমস্যা ছিল। বর্তমানে এ সমস্যা প্রায়ই সমাধান হয়ে গেছে। মহাখালীতে আমাদের কোনো বিশ্রামাগার ছিল না। এখানে আমাদের স্টাফদের জন্য বিশ্রামাগার রয়েছে। পূর্বাচল বাস ডিপোতে এসে আমরা বেশ সুবিধা পাচ্ছি।’

আরেক চালক লিটন মন্ডল বলেন, ‘মহাখালী বাসটার্মিনালে নানামুখী সমস্যা। ওখানে ঢুকতে সমস্যা। জায়গা কম কিন্তু গাড়ির সংখ্যা অনেক বেশি। রাস্তায় জ্যাম বেধে যায়। পুলিশ নাজেহাল করে। গাড়িতে কোনো জিনিসপত্র ঠিকমতো রাখতে পারি না। কয়েকদিন আগে গ্লাস খুলে ভেতরে ডুকে সুপারভাইজার আর আমার মিলে বেশ কিছু টাকা ও মোবাইলসহ চুরি করে নিয়ে গেছে। কিন্তু পূর্বাচল ডিপোতে অনেক ভালো ও সুন্দর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখানে গতকালকের নাইটে এসেছি, এখন পর্যন্ত একবারও গাড়ি স্টার্ট করতে হয়নি। এটা মহাখালী টার্মিনাল হলে অন্তত ৫০ বার গাড়ি এদিক সেদিক নেওয়া লাগতো।’

বিজ্ঞাপন

শাহ ফতেআলী এন্টারপ্রাইজের সুপারভাইজার খাদেমুল ইসলাম বলেন, ‘মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে যাত্রী নামিয়ে আমরা পূর্বাচল ডিপোতে চলে আসি। এখানে যানজট নেই, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাও রয়েছে। কোনো অতিরিক্ত খরচ নেই। প্রশাসন আমাদের পর্যাপ্ত সহযোগিতা দিচ্ছে। এখানে টয়লেট এবং গোসল করতে কোনো টাকা লাগে না।’

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তবে বাসের সংখ্যা বাড়লে কিছু অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে বলে জানান তিনি। খাদেমুল ইসলাম বলেন, ‘গাড়ির সংখ্যা বেড়ে গেলে বিশ্রামাগারের স্টাফদের সংকুলান হয় না। টয়লেট ও গোসলখানার সংখ্যা তুলনামূলক কম। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার একটু সমস্যা রয়েছে। এসব দিকে আরেকটু নজর দিলে গাড়ির সংখ্যা আরও বাড়বে।’

ঢাকা জেলা বাস মিনিবাস সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সহসভাপতি ইউসুফ মির্জা বলেন, ‘মহাখালী বাসটার্মিনাল এলাকায় রাস্তায় কোনো গাড়ি না থাকার লক্ষ্যে সরকার পূর্বাচলে বাস ডিপো তৈরি করে দিয়েছে। প্রথম দিকে কিছু সমস্যা ছিল। কিন্তু গতমাস থেকে মহাখালীর বেশিরভাগ গাড়ি পূর্বাচল ডিপোতে যাতায়াত করছে। বর্তমানে প্রতিদিন দেড়শ থেকে দুশো গাড়ি পূর্বাচলে যাচ্ছে।’

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘মহাখালী এলাকায়ও আমরা এর সুফল লক্ষ্য করছি। এখানে যানবাহনের গিরিঞ্জি (জট) পরিবেশটা অনেকটাই কমেছে। পূর্বাচলে সবসময় ৮০-৯০টি গাড়ি থাকে। যে গাড়িগুলো সকালে আসে আবার বিকেলে ট্রিপ নিয়ে যায়, ওই গাড়িগুলো আমরা পূর্বাচল ডিপোতে পাঠিয়ে দেই। এখন আমরা রাস্তায় কোনো গাড়ি রাখতে দেই না। মহাখালী টার্মিনাল এখন ফাঁকা।’

ইউসুফ মির্জা আরও বলেন, ‘যে গাড়িগুলো দুই থেকে তিন ঘণ্টার ভেতরে ট্রিপে চলে যাবে, সেই গাড়িগুলো শুধু মহাখালী টার্মিনালে থাকবে। অপেক্ষমাণ গাড়িগুলো বর্তমানে পূর্বাচল ডিপোতে রাখা হচ্ছে।’

ডিপোতে দায়িত্ব পালনকারী ট্রাফিক পুলিশের টিএসআই নুর আলম জানান, ‘আজ ১৫১টি গাড়ি এসেছে। এছাড়া বিভিন্ন ওয়ার্কশপের কাজে আসা ও ডাম্পিংসহ দুই শতাধিক গাড়ি ছিল। বেশ কিছু গাড়ি ট্রিপে যাওয়ার পরও এখনো এখানে ৭৬টি গাড়ি রয়েছে।’

বিজ্ঞাপন

পূর্বাচল ডিপোর দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ ইনচার্জ এসআই মাসুদ রানা বলেন, ‘গতমাস থেকে ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ১৫০-২০০ গাড়ি এখানে যাতায়াত করছে। আশা করছি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির সংখ্যা আরও বাড়বে।পুলিশ এখানে আসা গাড়ি এবং স্টাফসহ ডিপোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করছে।’

পরিবহনসংশ্লিষ্টদের মতে, পূর্বাচল ডিপোতে অপেক্ষমাণ বাস রাখার ব্যবস্থা আরও সম্প্রসারণ এবং যাত্রী ও পরিবহনকর্মীদের প্রয়োজনীয় সুবিধা বাড়ানো গেলে উদ্যোগটির সুফল আরও বাড়তে পারে। এরই মধ্যে মহাখালী এলাকায় সড়কের ওপর বাস দাঁড়িয়ে থাকার প্রবণতা কমায় যানজট পরিস্থিতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD