১৯৯১ সালে যেভাবে ১৪০ আসনে জয় পেয়ে ক্ষমতায় ফিরেছিল বিএনপি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যতিক্রমী অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। ওই নির্বাচনের ফলাফল শুধু ক্ষমতার পালাবদলই ঘটায়নি, বরং দেশের রাজনীতির গতিপথেও বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছিল। সাধারণ ধারণা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণের বিপরীতে গিয়ে বিএনপি ১৪০টি আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে, যা তখন অনেকের কাছেই ছিল বিস্ময়কর।
বিজ্ঞাপন
নির্বাচনের আগের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় আসবে—এমন বিশ্বাস ছিল প্রবল। কারণ, স্বৈরাচারবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনের সময় বিএনপির বহু গুরুত্বপূর্ণ নেতা দল ছেড়ে যাওয়ায় সাংগঠনিকভাবে দলটি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। বিপরীতে আওয়ামী লীগ ছিল তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ও বিস্তৃত সংগঠনের অধিকারী। তা সত্ত্বেও ভোটের ফলাফল সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে।
এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশে কার্যত দ্বিদলীয় রাজনীতির সূচনা হয় এবং সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। একই সঙ্গে সব রাজনৈতিক দলের সম্মতিতে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের একটি দৃষ্টান্তও স্থাপিত হয় ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির ওই ভোটে।
বিজ্ঞাপন
নির্বাচনী ফল ও সরকার গঠন
১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসনে জয় পায়। আওয়ামী লীগ পায় ৮৪টি আসন এবং সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। জাতীয় পার্টি জয়লাভ করে ৩৫টি আসনে, আর জামায়াতে ইসলামী পায় ১৮টি আসন। পরবর্তীতে জামায়াতের সমর্থন নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে এবং খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
বিএনপির জয় কি আগে আঁচ করা গিয়েছিল
বিজ্ঞাপন
বিএনপির অনেক নেতার ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচনের বেশিরভাগ সময়েই দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নিশ্চিত ছিল না যে তারা ক্ষমতায় যেতে পারবে। লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, সে সময় বিএনপির নেতারা বরং ধরে নিয়েছিলেন যে তারা বিরোধী দলে বসতে যাচ্ছেন। কারণ, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তি ছিল ব্যাপক এবং এরশাদ সরকারের সময়ে বিএনপিকে ভাঙার নানা প্রচেষ্টা দলের ভিত নড়বড়ে করে দিয়েছিল।
তবে নির্বাচনের মাঠপর্যায়ে কাজ করা নেতারা ভোটের আগের সপ্তাহে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির পরিবর্তন লক্ষ্য করতে শুরু করেন।
বিএনপির হয়ে আসনভিত্তিক মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় জানান, শেষ দিকে তারা ‘ভালো বাতাস’ পাচ্ছিলেন এবং কিছুটা হলেও বুঝতে পারছিলেন যে ফলাফল অনুকূলে আসতে পারে।
বিজ্ঞাপন
ভাষণ, আত্মবিশ্বাস ও জনমত
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে দুই প্রধান নেত্রীর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণ ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখে। আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার ভাষণ ছিল মূলত অতীতের সামরিক শাসন ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের তীব্র সমালোচনামুখর। এতে বক্তব্যের ভঙ্গি ও অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক টোন নিয়ে সমালোচনা সৃষ্টি হয়।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে খালেদা জিয়ার ভাষণে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার ভূমিকার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নিয়ে কিছু স্পষ্ট অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়। তার বক্তব্যে সাধারণ ভোটারদের কাছে এক ধরনের আবেদন ও প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যায়, যা শেষ পর্যন্ত বিএনপির পক্ষে জনমত গঠনে সহায়ক হয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, নেতাদের বক্তৃতায় দম্ভের প্রকাশ এবং নির্বাচনী প্রচারণায় কিছু বিতর্কিত বক্তব্যও দলটির জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল বলে মত দিয়েছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে প্রথম অভিজ্ঞতা
বিজ্ঞাপন
১৯৯১ সালের নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম পূর্ণাঙ্গ নির্বাচন, যা নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। সে সময়ের পত্রিকাগুলোর সম্পাদকীয়তেও ভোটারদের অবাধ ও নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের কথা গুরুত্ব পায়। শান্তিপূর্ণভাবে ভোট সম্পন্ন হওয়ায় দেশ-বিদেশে এই নির্বাচন প্রশংসিত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, নিরপেক্ষ পরিবেশে ভোটাররা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের সুযোগ পাওয়ায় সুইং ভোটারদের বড় একটি অংশ বিএনপির দিকে ঝুঁকে পড়ে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়ার ‘আপসহীন’ ভাবমূর্তি এবং আওয়ামী লীগের কৌশলগত ভুল মিলিয়ে এই নির্বাচনে একটি অপ্রত্যাশিত ফলাফল সৃষ্টি হয়।
বিজ্ঞাপন
রাজনৈতিক প্রভাব ও উত্তরাধিকার
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর আওয়ামী লীগের মধ্যেও আত্মসমালোচনার সুর দেখা যায়। দলের ভেতর থেকে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ও আত্মম্ভরিতাকে পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অন্যদিকে বিএনপির এই জয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে এবং পরবর্তী দশকগুলোতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে কেন্দ্র করে রাজনীতির মূল স্রোত গড়ে ওঠে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৯১ সালের নির্বাচন শুধু একটি সরকারের জন্ম দেয়নি, বরং বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারার পুনরুদ্ধার এবং দ্বিদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তিও স্থাপন করেছে, যার প্রভাব আজও দেশের রাজনীতিতে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
বিজ্ঞাপন
সূত্র: বিবিসি বাংলা








