যত দিন জামায়াত থাকবে, তত দিন দেশে আ. লীগ থাকবে: ফরহাদ মজহার

কবি, চিন্তক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফরহাদ মজহার বলেছেন, বাংলাদেশে যতদিন জামায়াতে ইসলামী নাম নিয়ে রাজনীতি চলবে, ততদিন আওয়ামী লীগও রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিদ্যমান থাকবে। একই সঙ্গে তিনি ১৯৭২ সালের সংবিধান বাতিল করে জনগণের সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে নতুন ‘গঠনতন্ত্র’ প্রণয়নের দাবি জানান।
বিজ্ঞাপন
রবিবার (২ আগস্ট) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে ‘৩৬ জুলাইয়ের অবদান, বিতর্ক ও ব্যর্থতার দায় পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি।
ফরহাদ মজহার বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অনন্য রাজনৈতিক অর্জন, যা কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ করা উচিত নয়। তিনি বলেন, ইসলাম একটি ধর্ম এবং এর নৈতিক ও মূল্যবোধগত দিক রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, ধর্মের নাম ব্যবহার করে রাজনৈতিক দল পরিচালনার তিনি বিরোধী।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তার ভাষায়, জামায়াতে ইসলামী নাম নিয়ে রাজনীতি চলতে থাকলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অস্তিত্বও টিকে থাকবে। তাই তিনি ধর্মীয় পরিচয়ের পরিবর্তে নতুন রাজনৈতিক চিন্তার ভিত্তিতে রাজনীতি গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
বিজ্ঞাপন
বক্তব্যে ১৯৭২ সালের সংবিধান নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, বর্তমান সংবিধান জনগণের প্রকৃত সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। তাঁর দাবি, সংবিধানের পরিবর্তে এমন একটি নতুন ‘গঠনতন্ত্র’ প্রয়োজন, যা জনগণের প্রত্যক্ষ সম্মতিতে প্রণীত হবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হবে।
তিনি বলেন, জনগণই রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত মালিক। তাই জনগণের অধিকার থাকা উচিত প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রীয় কাঠামো প্রণয়ন করার।
২০২৫ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া নিয়েও নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরেন ফরহাদ মজহার। তাঁর দাবি, সে সময় জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী একটি পূর্ণ ক্ষমতাসম্পন্ন অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা সম্ভব হয়নি।
বিজ্ঞাপন
তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় শক্তির কারণে প্রত্যাশিত কাঠামো বাস্তবায়িত হয়নি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পুরোনো সাংবিধানিক কাঠামো বহাল রেখে সরকার গঠন করায় কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা করেন ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, সরকারব্যবস্থার প্রকৃত চরিত্র বিশ্লেষণের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে গণমাধ্যম ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছে। তাঁর মতে, রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রশ্নে বাস্তবতা তুলে ধরা প্রয়োজন ছিল।
গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া তরুণদের সাহসিকতার প্রশংসা করে তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানান, যেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতি কোনো ধরনের দমন-পীড়ন না চালানো হয়।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, নতুন প্রজন্ম যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়ে আন্দোলন করেছে, সেই আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান জানাতে হবে। ভবিষ্যতের রাজনীতিতে তরুণদের আস্থার জায়গা নষ্ট করা হলে তা দেশের জন্য ক্ষতিকর হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মাজার ভাঙচুরসহ ধর্মের নামে সহিংস কর্মকাণ্ডেরও সমালোচনা করেন ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, ধর্মকে ভয় দেখানো বা নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা নয়। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের ইসলামের একমাত্র প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে দাবি করতে পারে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
গণঅভ্যুত্থানের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় পর দেশে মতপ্রকাশের সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং এটিকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, এখন প্রয়োজন ভবিষ্যতের রাষ্ট্রগঠন ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পন্ন করা।
বিজ্ঞাপন
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সাবেক উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ। তিনি বলেন, ১৯৭১ ও ২০২৪—উভয় সময়ের চেতনা ধারণ করে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের পথে এগোতে হবে। দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং পুরোনো রাষ্ট্রীয় কাঠামো পরিবর্তন ছাড়া টেকসই সংস্কার সম্ভব নয় বলেও তিনি মত দেন।
সভায় সভাপতিত্ব করেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান। এছাড়া সাবেক উপদেষ্টা ও এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া, আইনজীবী আবু হেনা রাজ্জাকী, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন।








