Logo

শেখ হাসিনার সামনে দেশে ফিরতে কতটা খোলা পথ?

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৮ আগস্ট, ২০২৬, ১৬:৩০
শেখ হাসিনার সামনে দেশে ফিরতে কতটা খোলা পথ?
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের নয়াদিল্লিতে সম্প্রতি শেখ হাসিনার দেওয়া বক্তব্যের পর আবারও আলোচনায় এসেছে তার বাংলাদেশে ফেরার সম্ভাবনা। তিনি আদৌ দেশে ফিরবেন কি না, ফিরলে কখন এবং কী প্রক্রিয়ায় ফিরবেন—এসব প্রশ্ন ঘিরে রাজনৈতিক, আইনগত ও কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতা হারিয়ে ভারতে অবস্থান নেওয়ার পর গত দুই বছরে বিভিন্ন সময়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রসঙ্গ সামনে এসেছে। তবে এবারই প্রথম কোনো সংবাদ সম্মেলনে তিনি প্রকাশ্যে দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষার কথা জানিয়েছেন। ফলে তার বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়েও তৈরি হয়েছে নানা বিশ্লেষণ।

একদিকে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়ে আসছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ও দিল্লির কাছে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা করা হয়েছিল।

তবে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরানোর বিষয়ে ভারত এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে উল্লেখযোগ্য কোনো অবস্থান নেয়নি। বরং দুই দেশের প্রত্যর্পণ চুক্তিতে থাকা বিভিন্ন শর্তের কারণে ভারত চাইলে প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারে—এমন আলোচনা এরই মধ্যে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলে হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শেখ হাসিনা নিজে বাংলাদেশে ফিরতে চাইলে শুধু দেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে আইনি বাধা থাকার কথা নয়। তবে দেশে প্রবেশের পর তার বিরুদ্ধে চলমান ও বিচারাধীন মামলাগুলোর কারণে তাকে অবশ্যই আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে বিষয়টি শুধু আইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সমীকরণও গভীরভাবে জড়িত।

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ, কাগজে-কলমে দেশে ফেরার আইনি পথ থাকলেও বাস্তবে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নির্ভর করতে পারে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ঢাকা-নয়াদিল্লির পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর।

প্রত্যর্পণ চুক্তিতে কী বলা আছে

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সালে প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরে ২০১৬ সালে চুক্তিটি সংশোধন করা হয়। দুই দেশের মধ্যে অপরাধ দমন, সন্ত্রাস মোকাবিলা এবং এক দেশ থেকে অন্য দেশে পালিয়ে যাওয়া অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নিজ দেশে ফিরিয়ে আনার সহযোগিতাই ছিল এই চুক্তির অন্যতম উদ্দেশ্য।

বিজ্ঞাপন

চুক্তির আওতায় কোনো ব্যক্তি এক দেশে অপরাধ করে অন্য দেশে আশ্রয় নিলে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে সংশ্লিষ্ট দেশে ফেরত পাঠানোর সুযোগ রয়েছে।

প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে সংশ্লিষ্ট অপরাধের জন্য অন্তত এক বছরের শাস্তিযোগ্যতার বিষয়টি বিবেচনায় আসে। শুধু সরাসরি অপরাধ নয়, অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা বা অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রত্যর্পণের আওতায় পড়তে পারে।

তবে চুক্তিতে এমন কিছু বিধানও রয়েছে, যার মাধ্যমে কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব।

বিজ্ঞাপন

এর মধ্যে অন্যতম হলো—অভিযোগটি যদি রাজনৈতিক প্রকৃতির বলে বিবেচিত হয়, তাহলে প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু চুক্তিতে একই সঙ্গে কিছু গুরুতর অপরাধকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা না করার বিষয়ও উল্লেখ রয়েছে।

হত্যা, গুম, অনিচ্ছাকৃতভাবে মৃত্যু ঘটানো, বোমা বিস্ফোরণ এবং সন্ত্রাসবাদের মতো গুরুতর অপরাধ এর মধ্যে রয়েছে।

বাংলাদেশে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে হত্যা, গণহত্যা, গুম ও নির্যাতনসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা হয়েছে। ফলে এসব অভিযোগকে কেবল রাজনৈতিক মামলা হিসেবে দেখানোর সুযোগ কতটা রয়েছে, তা নিয়েও আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

২০১৬ সালের সংশোধনের পর প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আরও সহজ করা হয়। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মামলার বিস্তারিত সাক্ষ্য-প্রমাণের পরিবর্তে আদালতের জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানার কপি দিয়েও প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানানো সম্ভব।

অর্থাৎ, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কোনো মামলায় আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলে সেই পরোয়ানার ভিত্তিতে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে তাকে ফেরত দেওয়ার আবেদন করতে পারে।

চুক্তিতে অস্থায়ী গ্রেফতারের ব্যবস্থাও রয়েছে। কোনো ব্যক্তি পালিয়ে যেতে পারেন—এমন আশঙ্কা থাকলে কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাকে অস্থায়ীভাবে আটক করার অনুরোধ জানানো সম্ভব।

বিজ্ঞাপন

তবে এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। ভারতের যদি মনে হয়, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রকৃতপক্ষে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে সরল বিশ্বাসে করা হয়নি, তাহলে প্রত্যর্পণের আবেদন প্রত্যাখ্যানের সুযোগ রয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরানোর প্রশ্নে এই বিধানটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

দেশে ফেরার বক্তব্য কি রাজনৈতিক কৌশল?

বিজ্ঞাপন

গত দুই বছরে বিভিন্ন সময়ে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এবার সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ্যে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করায় বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর তার দেশত্যাগ এবং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি বাস্তবে কতটা সহজে দেশে ফিরতে পারবেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরলে রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এ কারণে তার দেশে ফেরার বক্তব্যকে কেউ কেউ কেবল ব্যক্তিগত ইচ্ছা হিসেবে দেখছেন না। এর পেছনে রাজনৈতিক কৌশলও থাকতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

তাদের যুক্তি, শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর তার রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয়েছে এবং দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে চাপের মধ্যে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশে ফেরার বার্তা দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে মনোবল তৈরি করতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, এটি বর্তমান সরকারকেও রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখার একটি কৌশল হতে পারে।

কারণ শেখ হাসিনা দেশে ফেরার কথা বললেও এখনো নির্দিষ্ট কোনো তারিখ ঘোষণা করেননি। ফলে তার বক্তব্যের বাস্তব উদ্দেশ্য নিয়ে নানা প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, তার বক্তব্যের একটি দিক দলের নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখা এবং অন্যদিকে বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করা হতে পারে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের কাছে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—শেখ হাসিনা যে দেশে অবস্থান করছেন, সেই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক। ফলে তার প্রত্যাবর্তন শুধু তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে কি না, সেটিও প্রশ্নের বিষয়।

দেশে ফিরলে কী হবে আইনি প্রক্রিয়া?

শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে এলে তাকে একাধিক আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হতে পারে। ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।

এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন আদালতে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আরও একাধিক মামলা রয়েছে। ফলে দেশে ফিরলে এসব মামলার আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী, তাকে ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করে বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। চলমান মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকলে দেশে প্রবেশের পর তাকে গ্রেফতার করার বিষয়টিও সামনে রয়েছে।

আইনজীবীদের মতে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর থাকলে দেশে প্রবেশের পর আইন অনুযায়ী তাকে গ্রেফতার করা হতে পারে।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩-এর বিধান অনুযায়ী রায়ের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আপিলের সুযোগ রয়েছে। তবে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও বিশেষ পরিস্থিতিতে উচ্চ আদালতের আপিল গ্রহণের বিষয়টি আইনি ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করতে পারে।

আরও পড়ুন

অন্যদিকে শেখ হাসিনার বৈধ পাসপোর্ট না থাকার বিষয়টিও দেশে ফেরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এ পরিস্থিতিতে ভ্রমণ অনুমতিপত্র বা ট্রাভেল পাসের মাধ্যমে দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

তবে সরকার তাকে এমন কোনো ভ্রমণ অনুমতি দেবে কি না, দিলে কী শর্তে দেবে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত কোথায়?

সবকিছু মিলিয়ে শেখ হাসিনার বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নটি একাধিক স্তরে জটিল। আইনগতভাবে দেশে ফেরার পথ পুরোপুরি বন্ধ নয়। কিন্তু দেশে প্রবেশের পর তার বিরুদ্ধে চলমান মামলা, আদালতের আদেশ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের কারণে তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।

অন্যদিকে ভারত থেকে তাকে প্রত্যর্পণের মাধ্যমে ফেরানোর বিষয়টি নির্ভর করবে দুই দেশের বিদ্যমান চুক্তি, ভারতের অবস্থান এবং কূটনৈতিক আলোচনার ওপর।

এর পাশাপাশি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বড় ভূমিকা রাখবে।

বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনা সত্যিই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, নাকি রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেশে ফেরার বিষয়টি সামনে আনছেন—তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।

আরেকটি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ—তিনি যে দেশে অবস্থান করছেন, সেই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থান কী। কারণ এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত শুধু ব্যক্তিগত ইচ্ছার ভিত্তিতেই নেওয়া সম্ভব কি না, সেটিও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনার বিষয়।

ফলে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এখন শুধু ‘তিনি ফিরতে চান কি না’—এই প্রশ্নে আটকে নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের রাজনীতি, বিচারিক প্রক্রিয়া, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সমীকরণ।

শেষ পর্যন্ত তিনি কবে এবং কীভাবে দেশে ফিরবেন, নাকি আদৌ ফিরবেন কি না—তার উত্তর নির্ভর করবে এই সবগুলো বিষয় কোন দিকে মোড় নেয় তার ওপর।

তথ্য সূত্র: বিবিসি বাংলা

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD