Logo

স্থানীয় নির্বাচনেও জয়-পরাজয়ের হিসাব আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকেই?

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১৩:৩৮
স্থানীয় নির্বাচনেও জয়-পরাজয়ের হিসাব আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকেই?
ছবি: সংগৃহীত

কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আনুষ্ঠানিকভাবে অংশ নিচ্ছে না বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। তবে দলটির সমর্থক ও ভোটারদের অবস্থান নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ের সমীকরণে আওয়ামী লীগের ভোটারদের ভূমিকা নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা নিজেদের সমর্থন বাড়ানোর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সমর্থক ভোটারদের মনোভাবও বিবেচনায় রাখছেন বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য। তবে এই ভোটব্যাংক সব এলাকায় সমান প্রভাব ফেলবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

আওয়ামী লীগের ভোট নিয়ে প্রার্থীদের হিসাব-নিকাশ

তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাতীয় রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এলেও স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের সমর্থক ও ভোটাররা পুরোপুরি হারিয়ে যাননি। ফলে দলটির সমর্থক ভোটারদের একটি অংশ কোন প্রার্থীকে সমর্থন করবেন, তা নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

এ কারণে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক শক্তি ও স্থানীয় সম্পর্কের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সমর্থক ভোটারদের অবস্থানও বিবেচনা করছেন। তবে নির্বাচনে তাঁদের ভোট কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে এলাকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি, প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা এবং ভোটারদের নিজস্ব সিদ্ধান্তের ওপর।

বিএনপির বক্তব্য: ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাই বড় শক্তি

বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল মনে করেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটের হিসাব দিয়ে বিচার করা ঠিক হবে না। তাঁর মতে, স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের অনুপস্থিতিতে প্রার্থীর পরিচিতি, গ্রহণযোগ্যতা ও জনসম্পৃক্ততা বেশি গুরুত্ব পাবে।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয়করণের পরিবেশ থাকলেও বিএনপি বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনে জয়ী হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে দিনাজপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলমের কথা উল্লেখ করেন তিনি।

আলালের বক্তব্য, আওয়ামী লীগের গত ১৭ বছরের শাসনামলের কর্মকাণ্ডের কারণে দলটির প্রতি মানুষের বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়েছে। সে কারণে স্থানীয় নির্বাচনে তাদের ভোটব্যাংক বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে না বলেও তিনি মনে করেন।

অতীতের নির্বাচনে দুই দলের ভোটের ব্যবধান

বিজ্ঞাপন

বিভিন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভোটের ব্যবধান কখনো কম, আবার কখনো উল্লেখযোগ্য ছিল। তথ্য অনুযায়ী, বিতর্কমুক্ত হিসেবে বিবেচিত চারটি নির্বাচনে দল দুটির ভোটের হার ছিল - ১৯৯১ সালে বিএনপি ৩০.৮১ শতাংশ, আওয়ামী লীগ ৩০.০৮ শতাংশ; ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ৩৭.৪৪ শতাংশ, বিএনপি ৩৩.৬১ শতাংশ; ২০০১ সালে বিএনপি ৪০.৮৬ শতাংশ, আওয়ামী লীগ ৪০.২১ শতাংশ এবং ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ৪৯ শতাংশ, বিএনপি ৩৩.২০ শতাংশ।

অন্যদিকে, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক রয়েছে। বিএনপি ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন বর্জন করে। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও বিরোধী দলগুলো ভোট গ্রহণের সময় নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তোলে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ ৭২ শতাংশ, ২০১৮ সালে ৭৪.৬৩ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ৬৫.১৫ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। তবে এসব নির্বাচনের পরিবেশ ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক থাকায় ফলাফল বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সেই প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা জরুরি।

বিজ্ঞাপন

জামায়াতের ভোট বৃদ্ধিতে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নেয়নি। ওই নির্বাচনে বিএনপি ৪৯.৯৭ শতাংশ এবং জামায়াতে ইসলামী ৩১.৭৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে।

রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করে, আওয়ামী লীগের কিছু সমর্থক ভোটার অন্য দলকে সমর্থন করায় নির্বাচনী ফলাফলে পরিবর্তন এসেছে। তবে তাঁদের কতজন কোন দলকে ভোট দিয়েছেন, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য পৃথক পরিসংখ্যান উল্লেখ করা হয়নি। ফলে জামায়াতের ভোট বৃদ্ধির পেছনে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভূমিকা কতটা ছিল, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

বিজ্ঞাপন

জামায়াতের দাবি: আগের মতো প্রভাব নেই

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ মনে করেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের আগের ভোটব্যাংক আর একই অবস্থায় নেই।

তাঁর বক্তব্য, অতীতের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটের হিসাব সুষ্ঠু প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেনি। জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলটির প্রতি অনেকের সমর্থন কমেছে বলেও তিনি দাবি করেন।

বিজ্ঞাপন

আযাদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে প্রার্থীর যোগ্যতা, জনপ্রিয়তা, স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ও জনসম্পৃক্ততা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে। সে কারণে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক নির্বাচনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে না বলে তিনি মনে করেন।

এনসিপির দৃষ্টিতে স্থানীয় নির্বাচনের সমীকরণ আলাদা

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নীতিনির্ধারণী ফোরামের রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য ও দলটির মিডিয়া উপকমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার মনে করেন, স্থানীয় নির্বাচনের বাস্তবতা জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে আলাদা।

বিজ্ঞাপন

তাঁর মতে, দলীয় প্রতীক না থাকায় ভোটের হিসাব জাতীয় নির্বাচনের মতো দলকেন্দ্রিক হবে না। বরং ভোটাররা স্থানীয় প্রার্থীদের ব্যক্তিগত পরিচিতি, যোগ্যতা ও এলাকার সঙ্গে তাঁদের সম্পৃক্ততাকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারেন।

ইউপি নির্বাচনের সময়সূচি ও অংশগ্রহণের সুযোগ

সারা দেশের প্রায় ৪ হাজার ৩০০ ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন পাঁচ ধাপে আয়োজনের সময়সূচি ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। প্রথম ধাপ আগামী বছরের ২১ জানুয়ারি এবং শেষ ধাপ ২৭ মে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

আরও পড়ুন

স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় ও প্রতীকহীন হওয়ায় রাজনৈতিক দলের পরিচয়ের বাইরে ব্যক্তিগতভাবে প্রার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে। তবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণের আইনি অবস্থান ও প্রযোজ্য বিধিনিষেধ সংশ্লিষ্ট আইন এবং নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনার ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।

বিশ্লেষকদের মতে, এলাকাভেদে বদলাবে ভোটের হিসাব

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক দিলারা চৌধুরীর মতে, জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে দলীয় অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হলেও স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, সামাজিক যোগাযোগ এবং অতীত কর্মকাণ্ড বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।

তিনি মনে করেন, আওয়ামী লীগের ভোটারদের সমর্থন কিছু এলাকায় জয়-পরাজয়ের ব্যবধান গড়ে দিতে পারে। তবে সব এলাকায় একই ধরনের প্রভাব পড়বে না। স্থানীয়ভাবে কে মানুষের জন্য কাজ করেছেন এবং কার গ্রহণযোগ্যতা বেশি, ভোটের সিদ্ধান্তে সেসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হবে।

নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং গুজবের প্রভাবও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বিভ্রান্তিকর তথ্য নির্বাচনী পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে।

সব মিলিয়ে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থক ভোটারদের অবস্থান কিছু এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে সেই ভোটব্যাংকই শেষ পর্যন্ত জয়-পরাজয় নির্ধারণ করবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, স্থানীয় জনসম্পৃক্ততা এবং এলাকাভিত্তিক রাজনৈতিক বাস্তবতাই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী ফলাফলের গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD