পুরো মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাই অযাচিত চাপ-সংকটের মুখে পড়তে পারে

দেশের মাদ্রাসাগুলোতে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় কার্যকর সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন জনপ্রিয় ইসলামী আলোচক মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারী। তাঁর মতে, দ্বীনি শিক্ষার মর্যাদা ও এ শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ধরে রাখতে প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা, সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিজ্ঞাপন
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা বলেন তিনি। আজহারী উল্লেখ করেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পরিচালিত কিছু মাদ্রাসা ও হিফজখানায় সিসি ক্যামেরা, যথাযথ তদারকি, মানসম্মত পরিবেশ এবং উন্নত পাঠদানব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় মাদ্রাসা শিক্ষার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মাদ্রাসা শিক্ষার প্রসারে এসব প্রতিষ্ঠানের অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, হাজারো আলিম, আলিমা ও দ্বীনদার প্রজন্ম গড়ে তোলার পেছনে মাদ্রাসাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই এ শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, শক্তিশালী, নিরাপদ ও আস্থাশীল করতে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
মিজানুর রহমান আজহারী বলেন, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হওয়ার অর্থ এই নয় যে সেগুলো জবাবদিহিতা, সুশাসন ও মানোন্নয়নের ঊর্ধ্বে থাকবে। বরং দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, নৈতিকতা ও জবাবদিহিতা আরও দৃশ্যমান হওয়া উচিত। প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অনুমোদন ও নিবন্ধন, মানসম্মত পাঠ্যক্রম, দক্ষ শিক্ষক, নিরাপদ অবকাঠামো, স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের আচরণ ও পাঠদান পদ্ধতি নির্ধারণে শিশুদের মনস্তত্ত্ব বোঝার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, শিক্ষকদের শুধু বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানে দক্ষ হলেই চলবে না; শিশুদের মানসিক বিকাশ, আবেগ ও শেখার ধরন বুঝে তাদের সঙ্গে বয়সোপযোগী ও মানবিক আচরণ করার সক্ষমতাও থাকতে হবে। এ জন্য শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে আবাসিক মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে শিক্ষক নিবন্ধন, অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা এবং গুরুতর অপরাধে জড়িত শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কালোতালিকাভুক্তির মতো পদক্ষেপ বিবেচনার কথা বলেন।
বিজ্ঞাপন
মাদ্রাসায় শাসনের নামে অতিরিক্ত শারীরিক শাস্তি, বেত্রাঘাত ও নির্যাতনের ঘটনাগুলো ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি মানুষের মনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে বলেও উল্লেখ করেন আজহারী। তিনি বলেন, শিশুদের মনে ভয়, অপমান কিংবা দীর্ঘমেয়াদি মানসিক আঘাত সৃষ্টি করে—এমন আচরণ শিক্ষার উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। শৃঙ্খলা থাকতে হবে প্রজ্ঞা, ভালোবাসা ও মানবিকতার ভিত্তিতে।
প্রতিটি মাদ্রাসায় শিশু সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গ্রহণযোগ্য ও নিষিদ্ধ আচরণ, অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের পদ্ধতি এবং ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সুরক্ষার বিষয়গুলো নীতিমালায় স্পষ্ট থাকতে হবে। শিক্ষার্থীরা যেন নির্ভয়ে অভিযোগ জানাতে পারে, সে জন্য নিরাপদ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং অভিযোগকারীর পরিচয় ও মর্যাদা রক্ষা করাও জরুরি।
গুরুতর নির্যাতনের ঘটনা অভ্যন্তরীণভাবে ধামাচাপা না দিয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানো এবং প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের আচরণের সুস্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ, একান্তে সাক্ষাৎ ও ব্যক্তিগত বার্তার ক্ষেত্রেও পেশাগত সীমারেখা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
বিজ্ঞাপন
আজহারী বলেন, গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে যথাযথ শাস্তিমূলক ও আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের একই ধরনের দায়িত্বে পুনর্নিয়োগ ঠেকাতেও কার্যকর ব্যবস্থা থাকা উচিত। তবে অভিযোগ ও প্রমাণিত অপরাধের মধ্যে পার্থক্য বজায় রেখে ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
মাদ্রাসা শিক্ষার মানোন্নয়নে আলিম-উলামা, পরিচালনা কমিটি, অভিভাবক, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষ ও শিশু সুরক্ষায় কাজ করা সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। সীমিত সামর্থ্যের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রশিক্ষণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও শিশু সুরক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করারও আহ্বান জানান।
মিজানুর রহমান আজহারী বলেন, এ পর্যালোচনার উদ্দেশ্য মাদ্রাসার বিরোধিতা করা নয়; বরং শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং দ্বীনি শিক্ষার মর্যাদা রক্ষা করা। নিজেদের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে আত্মসমালোচনা, জবাবদিহিতা ও সংস্কারের পথে এগিয়ে যাওয়াকে তিনি দায়িত্বশীলতার পরিচয় হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে, দ্বীনি শিক্ষার মর্যাদা ও সমাজের আস্থা অটুট রাখতে মাদ্রাসাগুলোতে এখনই কার্যকর, সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন








