Logo

কংক্রিটের খাঁচায় বন্দি রাজশাহী, তীব্র দাবদাহে পুড়ছে নগরবাসী

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
রাজশাহী
১৮ জুন, ২০২৬, ১৬:২২
কংক্রিটের খাঁচায় বন্দি রাজশাহী, তীব্র দাবদাহে পুড়ছে নগরবাসী
ছবি: সংগৃহীত

রাজশাহী শহরে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে সবুজ প্রকৃতি ও জলাশয়। একসময় পদ্মা নদীর প্রবাহ, বিস্তীর্ণ মাঠ, পুকুর-দিঘি আর ছায়াঘেরা পরিবেশের জন্য পরিচিত এই জনপদ এখন ধীরে ধীরে কংক্রিটের নগরীতে রূপ নিচ্ছে। এরই প্রভাব পড়ছে সরাসরি আবহাওয়ায়—দিন দিন বাড়ছে তাপমাত্রা, দীর্ঘ হচ্ছে গ্রীষ্মকাল এবং জনজীবন হয়ে উঠছে আরও অস্বস্তিকর।

বিজ্ঞাপন

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, গত দুই দশকে রাজশাহীতে প্রায় প্রতি বছরই তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি বা তার ওপরে উঠেছে। ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৪২.৬ ডিগ্রি, ২০২৪ সালে তা বেড়ে ৪৩ ডিগ্রিতে পৌঁছায়। চলতি বছরেও তাপমাত্রা প্রায় ৪০ ডিগ্রির ঘর ছুঁয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৪ সাল ছিল গত ৫২ বছরের মধ্যে অন্যতম উষ্ণতম বছর।

শুধু তাপমাত্রার পরিসংখ্যান নয়, গবেষণায়ও উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র।

বিজ্ঞাপন

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা অনুযায়ী, গত তিন দশকে নগরীর সবুজ এলাকা কমেছে প্রায় ২৬ শতাংশ, জলাধার কমেছে ৩ শতাংশ, আর এর বিপরীতে নির্মিত অবকাঠামো বেড়েছে প্রায় ২৮ শতাংশ। ফলে শহরের প্রাকৃতিক শীতলীকরণ ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

গবেষকরা বলছেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বহুতল ভবন বৃদ্ধি, কংক্রিটের রাস্তা এবং জলাশয় ভরাটের কারণে শহর এখন “আরবান হিট আইল্যান্ড” বা তাপদ্বীপে পরিণত হচ্ছে। দিনের বেলায় এসব স্থাপনা তাপ শোষণ করে এবং রাতে ধীরে ধীরে তা ছাড়ে, ফলে সারাদিনই শহর গরম থাকে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের এক অধ্যাপক মনে করেন, পদ্মা নদীর প্রবাহ কমে যাওয়া এবং জলভূমি হারিয়ে যাওয়ায় শহরের প্রাকৃতিক তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। তার ভাষায়, নদীর বিস্তীর্ণ চর আর জলাশয় কমে গিয়ে শহরে এক ধরনের “হিট চেম্বার” পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা পরিস্থিতিকে আরও শুষ্ক করে তুলছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী বিভাগের বহু নদী ও খাল এখন সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। শতাধিক জলাশয় দখল বা ভরাট করা হয়েছে বলেও জানা যায়। পরিবেশবিদরা বলছেন, জলাশয় কমে যাওয়ায় স্থানীয় জলবায়ুর ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, একসময় যেসব এলাকায় পুকুর ও সবুজ মাঠ ছিল, সেগুলো এখন ঘরবাড়ি ও স্থাপনায় ভরে গেছে। গত এক দশকে শতকরা ৯০ শতাংশের বেশি পুকুর ভরাট হয়ে গেছে বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি। এর ফলে বর্ষা মৌসুমে পানি ধারণক্ষমতা কমে যাচ্ছে, আবার গরমকালে বাড়ছে তাপমাত্রার তীব্রতা।

বিজ্ঞাপন

শহরের জনজীবনেও এর প্রভাব স্পষ্ট। দিনের বেলা প্রচণ্ড রোদ ও গরম বাতাসে মানুষ প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হচ্ছেন না। রিকশাচালক, অটোরিকশাচালক, দিনমজুর ও ছোট ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। যাত্রী কমে যাওয়ায় আয় কমেছে পরিবহন শ্রমিকদের, আর বাজারে ক্রেতা কমায় বিক্রিও কমে গেছে।

একাধিক গবেষক ও পরিবেশবিদ মনে করেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় নদী-খাল পুনঃখনন, জলাশয় সংরক্ষণ, ব্যাপক বৃক্ষরোপণ এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের উদ্যোগ জরুরি। তাদের মতে, পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব নগরায়ণ ছাড়া এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির ধারা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের স্থানীয় কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন, নগরায়ণের সঙ্গে সঙ্গে সবুজ এলাকা কমে যাওয়ায় পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তাদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে কিছুটা হলেও এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

বিজ্ঞাপন

রাজশাহী এখন এক ক্রান্তিকাল পার করছে—সবুজ হারিয়ে কংক্রিটের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে তাপমাত্রা, আর সেই উত্তাপে অস্বস্তিতে দিন কাটাচ্ছে নগরবাসী। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এই তাপদ্বীপ আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD