দুর্যোগ: কক্সবাজারে প্রস্তুত ৬৪৮ আশ্রয়কেন্দ্র ও কন্ট্রোল রুম

টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে কক্সবাজারে বন্যা, জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি একসঙ্গে বেড়ে যাওয়ায় জেলাজুড়ে চরম দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জেলার অন্তত ৩৫টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে, শতাধিক গ্রাম পানির নিচে চলে গেছে এবং লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
বিজ্ঞাপন
পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কায় জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যেতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ জন্য জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে চালু করা হয়েছে বিশেষ কন্ট্রোল রুম।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে গত পাঁচ দিনের টানা বর্ষণে জেলার ১০ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। দুর্যোগের কারণে অন্তত দেড় শতাধিক গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে এবং প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে কক্সবাজার সদর, উখিয়া, টেকনাফ, রামু, চকরিয়া, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরী ও ঈদগাঁও উপজেলা। এসব এলাকার নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকে বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কৃষিজমি এবং গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে গেছে। অনেক এলাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি পাহাড়ধসও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত চার দিনে জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধস এবং পানিতে ডুবে রোহিঙ্গাসহ অন্তত ২৪ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার চকরিয়া উপজেলায় আবারও পাহাড়ধসে দুই শিশুর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আরও একজন নারী আহত হন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কয়েক দিনের টানা বর্ষণে পাহাড়ের মাটি পুরোপুরি পানিসিক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে যেকোনো সময় নতুন করে বড় ধরনের পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষ করে পাহাড়ের পাদদেশ, ঢালু এলাকা এবং ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলোকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
কক্সবাজার জেলা প্রশাসন গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পাহাড়ঘেঁষা এলাকা এবং নিচু স্থানে বসবাসরত মানুষকে দ্রুত নিকটস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে সরকারি নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানিয়েছেন, জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ এবং জরুরি সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে সাধারণ মানুষকে কন্ট্রোল রুমের ০১৮৭২৬১৫১৩২ নম্বরে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য পর্যাপ্ত শুকনো খাবার মজুত রয়েছে। অতিরিক্ত খাদ্যসামগ্রীর চাহিদা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য ঢেউটিনসহ অন্যান্য জরুরি সহায়তা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।
বিজ্ঞাপন
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আবদুল হান্নান জানান, বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত আগের ৪৮ ঘণ্টায় জেলায় ২২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বর্তমানে কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রয়েছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী কয়েক দিন ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, অব্যাহত বৃষ্টিপাতের কারণে পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা এবং জলাবদ্ধতার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান না করে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, শত শত বাড়িঘরে ইতোমধ্যে পানি ঢুকে পড়েছে। বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। অনেক গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে চলে যাওয়ায় মানুষের চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিজ্ঞাপন
কক্সবাজার শহরের কলাতলী, সুগন্ধা, হোটেল-মোটেল জোন, বাজারঘাটা, তারাবনিয়াছড়া, আলীরজাহাল ও বাস টার্মিনাল এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে রয়েছে। অল্প সময়ের বৃষ্টিতেই শহরের অনেক সড়ক যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি পর্যটকরাও ভোগান্তিতে পড়েছেন।
সাগর উত্তাল থাকায় টানা সাত দিন ধরে টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন নৌপথে যাত্রীবাহী ট্রলারসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। একইভাবে কক্সবাজার-মহেশখালী এবং পেকুয়া-কুতুবদিয়া নৌরুটেও নৌযান চলাচল স্থগিত রয়েছে। এতে হাজারো যাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিশ্বের বৃহত্তম রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। টানা বর্ষণে সেখানে দুই শতাধিক পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অনেক পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় বহু বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে চলে গেছে। এসব এলাকায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। বিশেষ করে রাজাখালী, মগনামা ও উজানটিয়া ইউনিয়নের বহু গ্রাম সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু মাছের ঘেরে পানি আটকে থাকায় জলাবদ্ধতা আরও তীব্র হয়েছে। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না হওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। তারা প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ২০টি গ্রামের মানুষ টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। বহু পরিবার ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে এবং গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় জরুরি সেবাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক দিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে কক্সবাজারের সার্বিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থানরত মানুষকে সতর্ক থাকার পাশাপাশি প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।








