মনু-ধলাই নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন, বিপাকে নদীতীরের বাসিন্দারা

মৌলভীবাজারের মনু ও ধলাই নদীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি তালিকায় ২৭টি বালুমহাল থাকলেও এর বাইরে শতাধিক স্থানে ড্রেজার মেশিন ও ট্রলার ব্যবহার করে দিন-রাত বালু তোলা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
বিজ্ঞাপন
এতে নদীর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ার পাশাপাশি নদীতীরবর্তী মানুষের বসতভিটা ও কৃষিজমি ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। একই সঙ্গে ড্রেজার ও বালুবাহী ট্রলারের বিকট শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন দুই পাড়ের বাসিন্দারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মনু ও ধলাই নদীর বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে বালু উত্তোলন চলছে। সরকারি তালিকায় ২৪টি ইজারাকৃত ও তিনটি অনুমোদনহীনসহ মোট ২৭টি বালুমহাল রয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত বালুমহালের বাইরে নদীর বিভিন্ন অংশে শতাধিক স্থানে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
দিনের পর দিন অপরিকল্পিতভাবে বালু তোলার ফলে নদীর তলদেশ ও তীরবর্তী এলাকা গভীর হয়ে পড়ছে। এতে নদীভাঙনের ঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি বন্যার সময় ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় কৃষিজমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগ রয়েছে, বালু উত্তোলনে বাধা দিতে গেলে স্থানীয়দের রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের নাম ব্যবহার করে হুমকি ও চাপ দেওয়া হয়। ফলে অনেকেই প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছেন না।
নদীতীরের একাধিক বাসিন্দা বলেন, ড্রেজার মেশিন চালু হলে বিকট শব্দে ঘরে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। বালু উত্তোলনের সময় অনেক সময় ঘরবাড়িও কেঁপে ওঠে। অসুস্থ ব্যক্তি ও শিশুদের বেশি সমস্যা হয়। তারা অভিযোগ করেন, অবৈধ বালু উত্তোলনে বাধা দিলে বাড়িতে গিয়েও চাপ দেওয়া হয়। নদী ও নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী নিষিদ্ধ এলাকায় পাম্প, ড্রেজিং বা অন্য কোনো মাধ্যমে বালু বা মাটি উত্তোলনের সুযোগ নেই। একই সঙ্গে সেতু, কালভার্ট, বাঁধ, সড়ক, মহাসড়ক, রেললাইনসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা এবং আবাসিক এলাকা থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব বিধিনিষেধ উপেক্ষা করেই বিভিন্ন এলাকায় বালু উত্তোলন চলছে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
হাওর রক্ষা আন্দোলনের সদস্য সচিব এম খছরু চৌধুরী বলেন, অভিযোগ রয়েছে, ইজারা নেওয়া বালুমহালেও দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা মেশিন চালিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। নীতিমালা অনুযায়ী নদীর মধ্যভাগ থেকে বালু উত্তোলনের কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে নদীর পাড় ঘেঁষে বালু তোলা হচ্ছে। এতে নদীর তীর ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
স্থানীয়রা অবৈধ ড্রেজার উচ্ছেদ, নিষিদ্ধ এলাকায় বালু উত্তোলন বন্ধ, বালুবাহী ট্রলারের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল বন্ধ এবং শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, কার্যকর নজরদারি না থাকলে নদীভাঙন ও পরিবেশের ক্ষতি আরও বাড়বে।
বিজ্ঞাপন
মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, জেলায় মোট ২৭টি বালুমহালের মধ্যে চলতি অর্থবছরে ২৪টি ইজারা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মনু নদীতে ১২টি এবং ধলাই নদীতে দুটি বালুমহাল রয়েছে। ভ্যাট-ট্যাক্সসহ এসব বালুমহাল থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩১ কোটি ৩৫ লাখ ৩৮ হাজার ৫৩৪ টাকা।
তিনি বলেন, ইজারাদাররা নির্ধারিত এলাকার বাইরে বালু উত্তোলন করলে কিংবা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে তা তদন্ত করা হয়। বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের দায়ে জেল-জরিমানাও করা হচ্ছে এবং অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তবে স্থানীয়দের দাবি, বিচ্ছিন্ন অভিযান ও জরিমানার পাশাপাশি অবৈধ বালু উত্তোলনের উৎস বন্ধ করতে স্থায়ীভাবে নজরদারি বাড়াতে হবে। নদী, পরিবেশ ও নদীতীরের মানুষের বসতভিটা রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।








