প্রধান শিক্ষক নেই ৫৬ স্কুলে, কিন্ডারগার্টেনমুখী শেরপুরের শিক্ষার্থী

বিনা খরচে পড়াশোনা, বিনামূল্যে সরকারি বই, প্রশিক্ষিত শিক্ষক এবং তুলনামূলক ভালো অবকাঠামো—সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এসব সুবিধা থাকার পরও বগুড়ার শেরপুরে অভিভাবকদের একটি অংশ সন্তানদের কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি বিদ্যালয়ে পাঠাচ্ছেন। বাড়তি খরচ বহন করেও কেন তারা এসব প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকছেন, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
বিজ্ঞাপন
অভিভাবকদের ভাষ্য, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সুযোগ-সুবিধা থাকলেও শিক্ষার্থীদের প্রতি ব্যক্তিগত নজরদারি, নিয়মিত মূল্যায়ন, ইংরেজি শিক্ষায় গুরুত্ব এবং শিক্ষার্থীর অগ্রগতি সম্পর্কে অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগের ঘাটতি রয়েছে। এর সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রধান শিক্ষক সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, শেরপুর উপজেলায় মোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৩৭টি। এর মধ্যে ৫৬টি বিদ্যালয়েই বর্তমানে প্রধান শিক্ষক নেই। দীর্ঘদিন ধরে এসব পদে নিয়োগ না হওয়ায় প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রমে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
প্রধান শিক্ষক না থাকা বিদ্যালয়গুলোতে সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকেই কাউকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে একদিকে তাদের নিয়মিত শ্রেণিপাঠ পরিচালনা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে প্রধান শিক্ষকের প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক দায়িত্বও সামলাতে হচ্ছে। এতে শিক্ষকদের ওপর কাজের চাপ বাড়ার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের সার্বিক ব্যবস্থাপনায়ও প্রভাব পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিজ্ঞাপন
শিক্ষা বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১২ ও ২০১৮ সালে প্রধান শিক্ষক পদে কিছু নিয়োগ হলেও পরবর্তী সময়ে নিয়োগপ্রক্রিয়া প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। দীর্ঘদিনের এই শূন্যতার কারণে উপজেলার অর্ধশতাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কার্যত প্রধান শিক্ষকবিহীন অবস্থায় চলছে।
তবে সম্প্রতি জাতীয় পর্যায়ে নেওয়া সিদ্ধান্তের ফলে দীর্ঘদিনের এ সংকট কাটানোর উদ্যোগ শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে শিক্ষা বিভাগ। শূন্য পদগুলো পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি ফিরবে।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকার অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমান সময়ে শুধু বিনামূল্যে পড়াশোনা ও বই পাওয়াকে তারা শিক্ষার মান নির্ধারণের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে দেখছেন না। সন্তান নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাচ্ছে কি না, পাঠ বুঝতে পারছে কি না, পরীক্ষায় কেমন ফল করছে, কোন বিষয়ে দুর্বল এবং শিক্ষক তার পড়াশোনার বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখছেন কি না—এসব বিষয়ও তাদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
কয়েকজন অভিভাবক অভিযোগ করেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও অবকাঠামো থাকলেও সব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয় না। সন্তান বিদ্যালয়ে যাওয়ার পর সে কতটা শিখছে, তার দুর্বলতা কোথায়—এসব বিষয়ে অনেক সময় অভিভাবকদের সঙ্গে পর্যাপ্ত যোগাযোগ থাকে না।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি বিদ্যালয়গুলো নিয়মিত পরীক্ষা, বাড়ির কাজ, শিক্ষার্থীর উপস্থিতি এবং অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি সক্রিয় হওয়ায় অনেক পরিবার এসব প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকছেন।
বিজ্ঞাপন
এডুকেয়ার ইন্টারন্যাশনাল স্কুল (ইংলিশ ভার্সন)-এর পরিচালক সুমন আরবি বলেন, কিন্ডারগার্টেনগুলো শিক্ষার্থীদের প্রতি ব্যক্তিগত নজর এবং দায়িত্বশীলতার কারণে অভিভাবকদের কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে। শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম হওয়ায় প্রতিটি শিশুর পড়াশোনার বিষয়ে আলাদা করে নজর দেওয়া সম্ভব হয়। নিয়মিত পরীক্ষা, বাড়ির কাজ, পড়াশোনার তদারকি এবং অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগও এসব প্রতিষ্ঠানে বেশি করা হয়।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার বাস্তব চিত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠে গত ২১ জুলাই জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমানের আকস্মিক পরিদর্শনের পর। উপজেলার গাড়ীদহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনের সময় তিনি দেখতে পান, পঞ্চম শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থী ইংরেজি বই সঠিকভাবে পড়তে পারছে না। এমনকি রিডিংয়েও তাদের দুর্বলতা চোখে পড়ে।
এ সময় জেলা প্রশাসক বিদ্যালয়ের উপস্থিত শিক্ষকদের মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতা অর্জনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলা হয়।
বিজ্ঞাপন
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতায় দুর্বলতার বিষয়টি তুলনামূলক বেশি চোখে পড়ে বলে মনে করেন স্থানীয়দের কেউ কেউ।
অন্যদিকে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গত কয়েক বছরে দ্রুত বেড়েছে কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা। স্থানীয়দের ভাষায়, অনেক এলাকায় এসব প্রতিষ্ঠান অনেকটা ‘ব্যাঙের ছাতার মতো’ গড়ে উঠেছে। তবে সব কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার মান যে ভালো, এমনটিও মনে করেন না অভিভাবকরা।
তাদের মতে, কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ফলে শুধু সরকারি বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থী কমে কিন্ডারগার্টেনে যাওয়ার প্রবণতাই নয়, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান নিয়েও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
শিক্ষক আব্দুর রশিদ বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাতৃভাষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অন্যদিকে কিন্ডারগার্টেনগুলোতে শিশুর পড়াশোনার শুরু থেকেই ইংরেজি, স্পোকেন ইংলিশ ও উচ্চারণ চর্চায় বেশি জোর দেওয়া হয়। কিছু প্রতিষ্ঠান আবার আন্তর্জাতিক মানের কারিকুলাম অনুসরণের বিষয়টি প্রচার করে। এসব কারণে অভিভাবকদের একটি অংশ কিন্ডারগার্টেনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
আরেক শিক্ষক ফারুক আহমেদ বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনেক শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০ থেকে ৭০ জন পর্যন্ত হয়ে থাকে। কোনো কোনো শ্রেণিতে এর চেয়েও বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে। এত বেশি শিক্ষার্থীকে একই সঙ্গে পাঠদান এবং প্রত্যেকের ব্যক্তিগত দুর্বলতা চিহ্নিত করা একজন শিক্ষকের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, তুলনামূলক ছোট শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা সীমিত থাকায় কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকরা প্রতিটি শিশুর পড়াশোনার দিকে আলাদা নজর দিতে পারেন। ফলে অভিভাবকদের কাছে এসব প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
শিক্ষাবিদদের মতে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতি অভিভাবকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন বা বিনামূল্যে বই বিতরণ যথেষ্ট নয়। শ্রেণিকক্ষে কার্যকর পাঠদান, শিক্ষার্থীর মৌলিক দক্ষতা অর্জন, নিয়মিত মূল্যায়ন, শিক্ষক-অভিভাবক যোগাযোগ এবং বিদ্যালয়ের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
এ ছাড়া প্রধান শিক্ষক সংকট দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন। কারণ একজন প্রধান শিক্ষক শুধু প্রশাসনিক দায়িত্বই পালন করেন না; বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান, শিক্ষকদের সমন্বয়, উপস্থিতি, শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি এবং অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
শেরপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ পূরণের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত এ সংকটের সমাধান হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার মান বাড়াতে নিয়মিত তদারকি এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়টিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রেজোয়ান হোসেন বলেন, প্রধান শিক্ষক নিয়োগসংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি হওয়ায় শূন্য পদ পূরণে খুব দ্রুত নিয়োগ কার্যক্রম শুরু হবে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদানের মান, তদারকি ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আসতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হবে না; তবে নিবন্ধন না নিলে সরকারি বই ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হবে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ধরে রাখতে হলে অভিভাবকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিনামূল্যের শিক্ষা ও বইয়ের পাশাপাশি মানসম্মত পাঠদান, নিয়মিত মূল্যায়ন, ব্যক্তিগত পরিচর্যা এবং কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ৫৬টি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সংকট দ্রুত সমাধান করা গেলে প্রশাসনিক চাপ কমার পাশাপাশি শিক্ষার পরিবেশও আরও কার্যকর হবে।
বিজ্ঞাপন
শেরপুরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীদের একটি অংশের কিন্ডারগার্টেনমুখী হওয়ার প্রবণতা তাই শুধু অভিভাবকদের পছন্দের পরিবর্তন নয়; এর সঙ্গে সরকারি বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা, শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থী পরিচর্যার বিষয়গুলোও গভীরভাবে জড়িত। এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান উন্নতি করা গেলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতি অভিভাবকদের আস্থা আবারও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।








