Logo

চা-বাগানে হাসপাতাল আছে, চিকিৎসক নেই

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
মৌলভীবাজার
২৯ আগস্ট, ২০২৬, ১৪:৩৮
চা-বাগানে হাসপাতাল আছে, চিকিৎসক নেই
ছবি: প্রতিনিধি

মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন চা-বাগানে শ্রমিকদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল ও ডিসপেনসারি থাকলেও সেগুলোর অধিকাংশেই নেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও পর্যাপ্ত ওষুধ। কোথাও জীর্ণ ভবনে, আবার কোথাও সীমিত জনবল দিয়ে চলছে চিকিৎসাসেবা। ফলে দেশের চা শিল্পের অন্যতম প্রধান শ্রমশক্তি চা শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হয়েছে দুর্ভোগ।

বিজ্ঞাপন

চা-বাগানের শ্রমিকদের অভিযোগ, বাগানে চিকিৎসাকেন্দ্র থাকলেও সেখানে নিয়মিত এমবিবিএস চিকিৎসকের দেখা মেলে না। অনেক ক্ষেত্রে কম্পাউন্ডারদের ওপর নির্ভর করেই প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট থাকায় গুরুতর অসুস্থতা কিংবা দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে তাদের ছুটতে হয় দূরের হাসপাতাল বা শহরের চিকিৎসাকেন্দ্রে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমল এবং স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও অনেক চা-বাগানের স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো প্রত্যাশিতভাবে উন্নত হয়নি। অথচ চা শিল্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত শ্রমিক ও তাদের পরিবারগুলো দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছেন।

মৌলভীবাজারের বিভিন্ন চা-বাগানে শ্রমিকদের জন্য হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্র রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী এসব ডিসপেনসারিতে চিকিৎসক, মিডওয়াইফ বা নার্স এবং প্রয়োজনীয় সহায়ক কর্মী থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক বাগানেই নেই কোনো এমবিবিএস চিকিৎসক। ফলে সীমিত জনবল দিয়ে কোনো রকমে চিকিৎসাসেবা চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

কোথাও হাসপাতাল বা ডিসপেনসারির ভবনও ব্যবহার উপযোগী নয়। জীর্ণ দেয়াল, পুরোনো টিনের ছাদ কিংবা অপর্যাপ্ত জায়গার মধ্যেই কোনো কোনো চিকিৎসাকেন্দ্রের কার্যক্রম চলছে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতিও রয়েছে বলে অভিযোগ শ্রমিকদের।

চা শ্রমিকরা জানান, সাধারণ জ্বর, সর্দি-কাশি কিংবা ছোটখাটো অসুস্থতার ক্ষেত্রেও অনেক সময় প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যায় না। বিশেষ করে সাপে কাটা বা জোঁকের কামড়ের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ বা ইনজেকশন না থাকায় বিপাকে পড়তে হয়।

একজন শ্রমিক বলেন, প্রতিদিন বাগানের বিভিন্ন দূরবর্তী এলাকায় কাজ করতে যেতে হয়। অসুস্থ হয়ে পড়লে কাছাকাছি চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে দূরের হাসপাতাল বা শহরে যেতে হয়। এতে চিকিৎসা ব্যয়ের পাশাপাশি যাতায়াতের খরচও বহন করতে হয় তাদের।

বিজ্ঞাপন

শ্রমিকদের দাবি, প্রতিটি চা-বাগানের চিকিৎসাকেন্দ্রে অন্তত একজন যোগ্য চিকিৎসক, প্রয়োজনীয় ওষুধ, জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী নিশ্চিত করা দরকার। পাশাপাশি পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ হাসপাতাল ভবনগুলো সংস্কার করে আধুনিক চিকিৎসাকেন্দ্রে রূপান্তরেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

পাত্রকলা চা-বাগানের কম্পাউন্ডার রাজকুমার গঞ্জু বলেন, চা-বাগানের শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবায় সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো চিকিৎসকের সংকট। অধিকাংশ বাগানেই এমবিবিএস চিকিৎসক নেই। ফলে মূলত কম্পাউন্ডারদের ওপর নির্ভর করেই চিকিৎসা কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, নিয়মিত চিকিৎসক থাকলে শ্রমিকদের অনেক সমস্যার দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হতো। বর্তমানে গুরুতর রোগী হলে তাদের বাইরে পাঠাতে হয়।

মৌলভীবাজার জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান চা-বাগানের স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে বলেন, তিনি নিজেও জেলার কয়েকটি চা-বাগানের ডিসপেনসারি ও চিকিৎসাকেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। সেখানকার স্বাস্থ্যসেবার বর্তমান অবস্থা সন্তোষজনক নয়।

তিনি বলেন, প্রতিটি ডিসপেনসারিতে অন্তত একজন চিকিৎসক, মিডওয়াইফ অথবা নার্স এবং প্রয়োজনীয় সাপোর্ট স্টাফ থাকা প্রয়োজন। এতে চা শ্রমিকদের প্রাথমিক ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বাগান কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ফার্স্ট এইডের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর পরও বাংলাদেশ চা বোর্ডের কাছে কোনো ধরনের সহযোগিতা চাওয়া হলে যথাসময়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার জন্য তারা প্রস্তুত।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে শুধু চিকিৎসাকেন্দ্রের ভবন থাকলেই হবে না; সেখানে নিয়মিত চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জামও থাকতে হবে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ ও জরাজীর্ণ স্থাপনাগুলো দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন।

দেশের চা শিল্পের উৎপাদন ও অর্থনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা যদি দুর্বল থাকে, তাহলে তার প্রভাব তাদের পরিবার ও সামগ্রিক শ্রম উৎপাদনশীলতার ওপরও পড়তে পারে। তাই চা-বাগানের হাসপাতাল ও ডিসপেনসারিগুলো আধুনিকায়ন করে শ্রমিকদের জন্য সহজলভ্য ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD