Logo

অযত্ন-অবহেলায় ধ্বংসের পথে বাঘার ঐতিহাসিক নারী মসজিদ

profile picture
উপজেলা প্রতিনিধি
বাঘা, রাজশাহী
১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৮:২৭
অযত্ন-অবহেলায় ধ্বংসের পথে বাঘার ঐতিহাসিক নারী মসজিদ
ছবি: সংগৃহীত

মোগল আমলের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে রাজশাহীর বাঘার নারী মসজিদ অন্যতম। প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো এই স্থাপনায় মোগল স্থাপত্যরীতির নানা বৈশিষ্ট্যের ছাপ রয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের অযত্ন ও অবহেলায় ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি এখন ধ্বংসের পথে। মসজিদের পুরোনো নকশা অক্ষুণ্ন রেখে দ্রুত সংস্কার ও সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

বিজ্ঞাপন

রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ৪৯ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণে বাঘা উপজেলা সদরে হজরত শাহ মোয়াজ্জেম ওরফে শাহদৌলা (রহ.)-এর পুত্র হজরত শাহ আবদুর হামিদ দানিশ মন্দ (রহ.)-এর মাজারসংলগ্ন এলাকায় মসজিদটির অবস্থান। এর পাশেই রয়েছে হজরত জহর শাহ (রহ.)-এর মাজার। ঐতিহাসিক স্থাপনাটি দেখতে বছরজুড়েই পর্যটক ও দর্শনার্থীরা সেখানে আসেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্র হলেও ঐতিহ্যের সাক্ষী এই স্থাপনা সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেই। সীমানাপ্রাচীরেরও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। ফলে সন্ধ্যার পর মসজিদসংলগ্ন এলাকায় মাদকসেবনের আসর বসে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৩০ ফুট উঁচু একটি টিলার ওপর তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটি নির্মিত। বর্গাকার স্থাপনাটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২৭ ফুট এবং প্রস্থ ১৩ ফুট। চারপাশের দেয়াল প্রায় ৩ ফুট ৬ ইঞ্চি পুরু। পূর্বদিকে রয়েছে খিলান আকৃতির প্রবেশপথ। মসজিদটির নির্মাণে ব্যবহৃত ধূসর রঙের ইটের দৈর্ঘ্য প্রায় ১০ ইঞ্চি, প্রস্থ ৬ ইঞ্চি এবং পুরুত্ব দেড় ইঞ্চি। বর্তমান সময়ের প্রচলিত ইটের তুলনায় এগুলোর আকৃতি ও গঠন বেশ ভিন্ন।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

মসজিদের ভেতরে প্রবেশপথের ওপরে ফারসি ও আরবি ভাষায় পাথরে খোদাই করা শিলালিপি ছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। ওই শিলালিপি চুরির ঘটনাকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে নানা কাহিনিও প্রচলিত রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০০ বছর আগে পাঁচজন সঙ্গী নিয়ে সুদূর বাগদাদ থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বাঘায় আসেন হজরত শাহ মোয়াজ্জেম ওরফে শাহদৌলা (রহ.)। পদ্মা নদীর কাছাকাছি বাঘা এলাকায় তিনি বসবাস শুরু করেন। তার কর্মকাণ্ড ও ধর্মীয় প্রচারে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে ইসলাম গ্রহণের ঘটনাও স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয়দের মতে, ওয়াকফ এস্টেটের মোতাওয়াল্লি ষষ্ঠ রইশ সাইজুল ইসলামের আমলে রইশ পরিবারের পর্দানশিন নারী এবং বাইরের নারীদের নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। এ কারণেই এটি ‘নারী মসজিদ’ নামে পরিচিতি পায়।

বর্তমানে মসজিদের বিভিন্ন অংশে সংস্কারের অভাবে ক্ষয় দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও দেয়ালের পলেস্তারা ধসে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এখানে নামাজ আদায়ও হয় না। ফলে অযত্নে পড়ে থাকা স্থাপনাটির ভবিষ্যৎ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম বলেন, মসজিদের প্রবেশপথের ওপরে থাকা ফারসি ভাষায় পাথরে খোদাই করা শিলালিপিটি একসময় চুরি হয়ে যায়। তার দাবি, চুরির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে একজনের কিছুদিন পর পায়ে ক্ষত দেখা দেয়। পরে চুরি হওয়া পাথরটি মসজিদের ভেতরে রেখে যাওয়া হয়। এরপর আরেকজনেরও একইভাবে পায়ে সমস্যা দেখা দেয় এবং চিকিৎসার অংশ হিসেবে পা কেটে ফেললেও তিনি সুস্থ হননি। পরে দুজনই মারা যান। তাদের জীবদ্দশায় পাথর চুরির বিষয়টি তাদের মুখ থেকেই প্রকাশ পায় বলে জানান তিনি। তবে এ ঘটনার কোনো স্বাধীন প্রামাণ্য সূত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়নি।

বিজ্ঞাপন

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বাঘা জাদুঘরের সহকারী কাস্টোডিয়ান দবির উদ্দিন বলেন, প্রায় ৫০০ বছর আগে নারীদের জন্য মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল বলে এলাকায় প্রচলিত রয়েছে। এ কারণে এটি ‘নারী মসজিদ’ নামে পরিচিত হয়েছে।

তিনি বলেন, স্থাপনাটি বেশ পুরোনো হলেও এখনো প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের গেজেটভুক্ত হয়নি। গেজেটভুক্ত হলে পুরোনো নকশা অক্ষুণ্ন রেখেই মসজিদটির সংস্কার করা হবে।

স্থানীয়দের দাবি, গেজেটভুক্তির পাশাপাশি দ্রুত স্থাপনাটির সংস্কার ও সীমানাপ্রাচীরের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ঐতিহাসিক স্থাপনাটির পরিবেশ নিরাপদ ও দর্শনার্থীবান্ধব করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD