৭০ বছর ধরে পরিবেশ সবুজ করেছেন যিনি, আজ তার জীবনই অসহায়

বয়স ৮২ বছর। জীবনের প্রায় ৭০ বছরই কেটেছে গাছ লাগিয়ে। নিজের বাড়ির আঙিনা, প্রতিবেশীর উঠান কিংবা সরকারি রাস্তার পাশ যেখানেই একটু খালি জায়গা দেখেছেন, সেখানেই রোপণ করেছেন গাছ। শুধু নিজের গ্রাম নয়, আশপাশের অন্তত ১০ গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে আছে তার হাতে লাগানো হাজার হাজার গাছ। এ পর্যন্ত অন্তত ৫০ হাজার গাছ লাগিয়েছেন বলে জানান তিনি।
বিজ্ঞাপন
তিনি মসজিদের ইমাম সিরাজুল ইসলাম হাওলাদার। বরিশাল বিভাগের পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা উপজেলার ডাকুয়া ইউনিয়নের পূর্ব আটখালী গ্রামের বাসিন্দা। দীর্ঘদিনের বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যার কারণে এলাকাবাসীর কাছে তিনি ‘বৃক্ষপ্রেমী সিরাজুল ইসলাম’ হিসেবে পরিচিত।
তবে যে মানুষটি সারাজীবন প্রকৃতিকে সবুজ রাখতে কাজ করে গেছেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই মানুষটিই আজ চরম দুর্দশায় দিন কাটাচ্ছেন। বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে শরীর। দীর্ঘদিন ধরে নানা রোগে আক্রান্ত তিনি। এর মধ্যে নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার অভাবে কষ্ট পাচ্ছেন। অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতে পারছেন না। অসুস্থ শরীর নিয়েও থেমে নেই তার বৃক্ষরোপণ।
পটুয়াখালী শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে ডাকুয়া ইউনিয়নের একটি টিনশেড ঘরে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন সিরাজুল ইসলাম। ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে ঘুরলেই চোখে পড়ে তার লাগানো গাছ। কোনো কোনো গাছ ৪০-৫০ বছরের পুরোনো। গাছগুলোকে নিজের সন্তানের মতোই যত্ন করে বড় করেছেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
সিরাজুল ইসলাম জানান, ছোটবেলা থেকেই গাছ লাগানোর প্রতি তার আলাদা টান ছিল। বাড়িতে নিজেই বিভিন্ন প্রজাতির চারা তৈরি করতেন। আবার প্রয়োজন হলে বাজার থেকেও চারা কিনতেন। বর্ষাকালেই মূলত বেশি গাছ লাগাতেন। বছরের অন্য সময়গুলোতে সেসব গাছের পরিচর্যা করতেন।
তার লাগানো গাছের মধ্যে রয়েছে সুপারি, নারিকেল, পেয়ারা, জাম্বুরা, গাব, তাল, মেহগনি, রেইনট্রি ও সুন্দরীসহ নানা প্রজাতির গাছ।
বাবা আলতাফ হোসেন হাওলাদারের সাত ছেলের মধ্যে সবার ছোট সিরাজুল ইসলাম। ১৯৮৬ সালে ঢাকা নেছারিয়া কামিল মাদ্রাসা থেকে কামিল (এমএ) পাস করেন। এরপর গলাচিপা শহর ও নিজ গ্রামের বিভিন্ন মসজিদে প্রায় ৪৫ বছর ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
বিজ্ঞাপন
স্বল্প বেতনের ইমামতির আয় দিয়ে কোনোভাবে সংসার চালিয়েছেন। অভাব-অনটনের মধ্যেও বৃক্ষরোপণ থেকে কখনো নিজেকে দূরে রাখেননি। নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়েও চারা কিনে গাছ লাগিয়েছেন। বর্তমানে অর্থের সংকটে বাজার থেকে ধার-দেনা করে চারা কিনে রোপণ করছেন বলে জানান তিনি।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
সিরাজুল ইসলাম বলেন, গাছ লাগাতেই আমার ভালো লাগে। এগুলো আমার সন্তানের মতো। খালি-পতিত জায়গা দেখলেই সেখানে গাছ লাগিয়ে দিই। জায়গাটার মালিক কে, সেটা বড় কথা নয়। সব জায়গায় গাছ লাগিয়ে সবুজের সমারোহ ঘটানোর পাশাপাশি প্রকৃতিকে সুস্থ রাখাই আমার উদ্দেশ্য।
বিজ্ঞাপন
কিন্তু সেই বৃক্ষপ্রেমী মানুষটির নিজের জীবন এখন যেন বিবর্ণ হয়ে এসেছে। দীর্ঘদিনের অসুস্থতা, বয়সের ভার ও অর্থকষ্টে তিনি মানবেতর জীবনযাপন করছেন। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতে না পেরে প্রতিনিয়ত শারীরিক কষ্ট সহ্য করছেন। অথচ অসুস্থ শরীর নিয়েও সুযোগ পেলেই হাতে তুলে নিচ্ছেন গাছের চারা।
স্থানীয়রা বলছেন, দীর্ঘ সাত দশক ধরে নিঃস্বার্থভাবে গাছ লাগিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন সিরাজুল ইসলাম। তার লাগানো অসংখ্য গাছ আজ এলাকার মানুষের ছায়া, ফল ও পরিবেশের সুরক্ষা দিচ্ছে। জীবনের শেষ সময়ে এসে এমন একজন বৃক্ষপ্রেমী মানুষের চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়া সমাজ ও রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্ব।
স্থানীয় বারেক হাওলাদার বলেন, সিরাজুল ইসলাম ছোটবেলা থেকেই গ্রামে ঘুরে গাছ লাগিয়ে আসছেন। তার লাগানো গাছ অনেকেই লক্ষ লক্ষ টাকা বিক্রি করেছেন। তবে সিরাজুল ইসলাম কখনোই সেই গাছের টাকা পায়নি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এখন চিকিৎসার অভাবে ভুগছেন। সরকারি ভাবে তাকে চিকিৎসা সহায়তা দিলে তিনি সুস্থ হয়ে উঠতেন।
বিজ্ঞাপন
এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ রক্ষায় অবদান রাখা প্রবীণ এই মসজিদ ইমামের পাশে সরকারি-বেসরকারি সহায়তা নিয়ে দাঁড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে তার সুচিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা ও প্রয়োজনীয় আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হলে জীবনের শেষ সময়ে কিছুটা স্বস্তি পাবেন তিনি।
সত্তর বছর ধরে যিনি অন্যের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গাছ লাগিয়েছেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এখন তার নিজের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন একটু সহায়তা, চিকিৎসা ও মানবিকতার হাত।








