তিন বছরেও চালু হয়নি ৮ কোটি টাকার শান্তিনিবাস

জীবনের শেষবেলায় অসহায় ও আশ্রয়হীন প্রবীণ নারীদের নিরাপদ আবাসন, চিকিৎসাসেবা ও স্বস্তিময় জীবন নিশ্চিত করতে লালমনিরহাটে নির্মাণ করা হয়েছিল ‘শান্তিনিবাস’। ৮ কোটি ১ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই ভবনে ৬০ বছরোর্ধ্ব ২৫ জন নারীর থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে হস্তান্তরের তিন বছর পেরিয়ে গেলেও চালু হয়নি প্রতিষ্ঠানটি। জনবল সংকটে তালাবদ্ধ ভবনটি এখন নিজেই যেন নিঃসঙ্গ।
বিজ্ঞাপন
লালমনিরহাট শহরের বালাটারি এলাকায় সরকারি শিশু পরিবার (বালিকা) প্রাঙ্গণে ২০২২ সালের ১৬ আগস্ট শান্তিনিবাসের নির্মাণকাজ শুরু হয়। কাজ শেষে ২০২৩ সালের ৩০ আগস্ট ভবনটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ও পদ সৃজন না হওয়ায় এখনো সেখানে প্রবীণ নারীদের বসবাস শুরু হয়নি।
শান্তিনিবাসে রয়েছে ২৫টি আধুনিক শয়নকক্ষ, উন্নত ডাইনিং ব্যবস্থা, লিফট, শরীরচর্চার জন্য জিমনেসিয়াম ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম। দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত থাকায় এসব মূল্যবান সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
এদিকে প্রায় ৪ লাখ ৮১ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় ভবনটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। ফলে রাতে পুরো ভবন অন্ধকারে ডুবে থাকে। পাশাপাশি লিফট রক্ষণাবেক্ষণের চুক্তির মেয়াদও শেষ হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে ভবনটির দেখভালের দায়িত্বে কেউ না থাকায় এর রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
লালমনিরহাট সরকারি শিশু পরিবারের উপ-তত্ত্বাবধায়ক হাওয়া খাতুন বলেন, ভবনটি কবে চালু হবে, তা তিনি বলতে পারবেন না। আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের প্রতিষ্ঠানকে এর দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। তবে ভবনটি একই প্রাঙ্গণে হওয়ায় তিনি অনানুষ্ঠানিকভাবে নজর রাখেন। তাঁর ভাষ্য, ভেতরের জিনিসপত্র এখনো মোটামুটি ভালো আছে। তবে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় রাতে ভবনটি অন্ধকারে থাকে।
ভবনটি দ্রুত চালুর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারাও। শিক্ষক আনিসুর রহমান লাডলা বলেন, তিন বছর আগে কাজ শেষ হলেও যাঁদের জন্য ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে, তাঁরা সেখানে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন না। দ্রুত জনবল নিয়োগ দিয়ে প্রবীণ নারীদের আবাসনের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।
সিনিয়র সাংবাদিক আবদুর রব সুজন বলেন, মহৎ উদ্দেশ্যে ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনটি উদ্বোধনের পর থেকেই তালাবদ্ধ পড়ে আছে। ব্যবহার না করায় আসবাবপত্র নষ্ট হচ্ছে, আবার বকেয়া বিলের কারণে বিদ্যুৎ সংযোগও নেই। এমন একটি দৃষ্টিনন্দন ভবনের পরিণতি হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) লালমনিরহাটের সহসভাপতি আবু হাসনাত রানা বলেন, এটি একটি ভালো উদ্যোগ হলেও অবহেলায় ভেতরের সরঞ্জাম, ডাইনিং ও লিফট নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ভবনটিতে কোনো কেয়ারটেকারও নেই। একজন নাগরিক হিসেবে তিনি দ্রুত শান্তিনিবাস চালুর দাবি জানান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অবকাঠামো নির্মাণ ও সরঞ্জাম স্থাপনের কাজ শেষ হলেও প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং পদ সৃজনের প্রক্রিয়া আটকে ছিল। এই প্রশাসনিক জটিলতার কারণেই কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
লালমনিরহাট জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক ফজলুল হক বলেন, সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে এ ধরনের আটটি শান্তিনিবাস নির্মাণ করা হয়েছে। ২০২৩ সালের জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অবকাঠামো ও সরঞ্জাম বুঝে নেওয়া হয়। কিন্তু জনবলের পদ সৃজন না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি চালু করা যায়নি।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও জানান, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জনবল নিয়োগের অনুমোদন পাওয়া গেছে এবং এ-সংক্রান্ত কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। নিয়োগ সম্পন্ন হলে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে দ্রুত শান্তিনিবাস চালু করা হবে।
প্রবীণ নারীদের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য নির্মিত প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত চালু না হলে সরকারি অর্থে কেনা মূল্যবান সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি আশ্রয়প্রত্যাশী নারীরাও তাঁদের প্রাপ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হতে থাকবেন। তাই জনবল নিয়োগ ও প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন করে শান্তিনিবাস চালুর দিকে তাকিয়ে আছেন স্থানীয়রা।








