বাকেরগঞ্জে করখানা-পান্ডব নদীর ভাঙনে নিঃস্ব শত শত পরিবার

বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার কবাই ইউনিয়নে করখানা ও পান্ডব নদীর অব্যাহত ভাঙনে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, কৃষিজমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, কবরস্থান ও গ্রামীণ সড়কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। ভিটেমাটি ও জীবিকার অবলম্বন হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন শত শত পরিবার।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে না তুললে নদীভাঙনে কবাই ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা হারিয়ে যাবে। এতে আরও বহু পরিবার বসতভিটা ও জীবিকার সংকটে পড়বে।
সরেজমিনে জানা যায়, একসময় এলাকার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত শিয়ালঘুনি বাজার ও কবাই বাজার ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে শিয়ালঘুনি ও লক্ষ্মীপাশা গ্রামের বিভিন্ন অংশ ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। নদীর পাড়ে প্রতিনিয়ত ধস নামায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদীতীরবর্তী বাসিন্দারা।
ভাঙনের কারণে অনেক পরিবার একাধিকবার ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। কেউ আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন, কেউ অস্থায়ী ঘর তুলে বসবাস করছেন। আবার কোনো কোনো পরিবার খোলা আকাশের নিচেও দিন কাটাচ্ছে। শত শত একর আবাদি জমি নদীতে বিলীন হওয়ায় কৃষিনির্ভর পরিবারগুলো হারিয়েছে আয়ের প্রধান উৎস। জীবিকার সংকটে অনেক পরিবার ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। কেউ কেউ কাজের সন্ধানে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন।
বিজ্ঞাপন
নদীভাঙনের প্রভাব পড়েছে স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থায়ও। প্রায় দুই বছর আগে করখানা নদীর ভাঙনে শিয়ালঘুনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি বিলীন হয়ে যায়। এরপর থেকে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের বারান্দায় অস্থায়ীভাবে পাঠদান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
উপযুক্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় বর্ষাকাল ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পড়াশোনা ও স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দীর্ঘদিনেও বিদ্যালয়ের জন্য স্থায়ী ব্যবস্থা না হওয়ায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্বেগ বাড়ছে।
বিজ্ঞাপন
লক্ষ্মীপাশা গ্রামের বাসিন্দা শিখা রানী নদীভাঙনের দুর্ভোগ তুলে ধরে বলেন, “কয়েকবার আমাদের বসতঘর নদীতে হারিয়ে গেছে। গত বছর কবাই ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি কামরুল হাসান রুবেল আমাদের একটি নতুন ঘর নির্মাণ করে দিয়েছেন। এখন সেই ঘরও নদী ভাঙ্গনের মুখে পড়েছে। মাথা গোজার শেষ ঠাই টুকু নদীতে হারিয়ে গেলে আমরা নিঃস্ব হয়ে যাব।”
তাঁর মতো অনেক পরিবারই বারবার ঘরবাড়ি হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে। নতুন করে বসতি গড়ার সামর্থ্য না থাকায় তাঁদের জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে নদীভাঙন চললেও স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ায় বসতভিটা, ফসলি জমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিজ্ঞাপন
এলাকাবাসীর দাবি, করখানা ও পান্ডব নদীর ভাঙনপ্রবণ এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প গ্রহণ, টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি জমি হারানো কৃষকদের জন্য বিশেষ আর্থিক সহায়তা ও জীবিকা পুনর্গঠনের কর্মসূচি চালুর আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জাবেদ ইকবাল বলেন, খুব শিগগিরই কবাই ইউনিয়নের করখানা ও পান্ডব নদীর ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করা হবে। পরিস্থিতি মূল্যায়নের পর প্রয়োজনীয় বরাদ্দের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হবে।
নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রত্যাশা, পরিদর্শন ও মূল্যায়নের পর দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। এতে বসতভিটা, কৃষিজমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দুর্ভোগ কমবে।








