Logo

ন্যানো ইউরিয়ায় ফলন বাড়ার সম্ভাবনা, মাঠপর্যায়ে গবেষণা আরডিএর

profile picture
উপজেলা প্রতিনিধি
শেরপুর, বগুড়া
৫ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:১৫
ন্যানো ইউরিয়ায় ফলন বাড়ার সম্ভাবনা, মাঠপর্যায়ে গবেষণা আরডিএর
ছবি: সংগৃহীত

প্রচলিত ইউরিয়া সারের বিকল্প হিসেবে দেশে উদ্ভাবিত ন্যানো ইউরিয়া কৃষি উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা, উৎপাদন ব্যয় ও ফলনের পরিবর্তন যাচাই করতে বগুড়ার পল্লী উন্নয়ন একাডেমিতে (আরডিএ) চলছে মাঠপর্যায়ের গবেষণা।

বিজ্ঞাপন

প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ধানগাছের বৃদ্ধি, সবুজত্ব ও শীষের দৈর্ঘ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন গবেষকেরা। তবে এর চূড়ান্ত কার্যকারিতা ও অর্থনৈতিক সুবিধা নির্ধারণে গবেষণা অব্যাহত রয়েছে।

আরডিএ সূত্রে জানা গেছে, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. জাবেদ হোসেন খানের উদ্ভাবিত তরল ন্যানো ইউরিয়া নিয়ে এ গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। গবেষণার জন্য একাডেমির প্রদর্শনী খামারে ১২টি প্লট তৈরি করা হয়েছে। র‍্যান্ডমাইজড কমপ্লিট ব্লক ডিজাইন (আরসিবিডি) পদ্ধতিতে ন্যানো ইউরিয়া ও ন্যানো এনপিকে প্রয়োগ করে পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। আগের মৌসুমে গবেষণার পর এবার ব্রি ধান-১০৩ জাতের ধানে সারের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

গবেষকেরা জানান, তরল ন্যানো ইউরিয়া পানির সঙ্গে মিশিয়ে স্প্রে মেশিনের মাধ্যমে সরাসরি ধানগাছের পাতায় প্রয়োগ করা হয়। প্রচলিত দানাদার ইউরিয়ার মতো জমিতে ছিটিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ধানগাছের বৃদ্ধি, সবুজত্ব এবং শীষের দৈর্ঘ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। একই সঙ্গে এক লিটার ন্যানো ইউরিয়া দিয়ে প্রচলিত ২৫ কেজি ইউরিয়ার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

গবেষকদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রচলিত ইউরিয়া ব্যবহারে বিঘাপ্রতি প্রায় ৪ হাজার ২০০ টাকা ব্যয়ের বিপরীতে ন্যানো ইউরিয়া প্রয়োগে খরচ হতে পারে প্রায় ২৩০ টাকা। তবে এই হিসাবের ভিত্তি ও জমির পরিমাণ বিবেচনায় প্রকৃত সাশ্রয় নির্ধারণে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন। গবেষণার চূড়ান্ত ফলাফল পাওয়ার পরই অর্থনৈতিক সুবিধার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

ন্যানো ইউরিয়ার বিশেষত্ব হলো, পাতার মাধ্যমে উদ্ভিদে পুষ্টি সরবরাহ করা। গবেষকদের মতে, প্রচলিত ইউরিয়া মাটিতে প্রয়োগের পর বাষ্পীভবন ও বৃষ্টির পানির কারণে সারের একটি অংশ অপচয় হতে পারে। ন্যানো প্রযুক্তিতে অতি ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমে নাইট্রোজেন সরবরাহ করায় উদ্ভিদের পুষ্টি গ্রহণের দক্ষতা বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এতে সারের অপচয় কমানোর পাশাপাশি মাটিতে রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত চাপ হ্রাস পেতে পারে। এ সম্ভাবনা যাচাইয়ে গবেষণার অংশ হিসেবে মাটির গুণাগুণও পরীক্ষা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় কৃষক সুলতান মোহাম্মদ জানান, প্রচলিত পদ্ধতিতে এক একর জমিতে প্রায় ১০০ কেজি ইউরিয়া প্রয়োগ করতে হয়। এতে খরচ হয় প্রায় ২ হাজার ৯০০ টাকা। অন্যদিকে ন্যানো সার ব্যবহারে ব্যয় হতে পারে প্রায় ৬০০ টাকা। তাঁর হিসাবে, এতে একরপ্রতি প্রায় ২ হাজার ৩০০ টাকা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রচলিত সার ব্যবহারে একরে প্রায় ২২ মণ ধান পাওয়া যায়। ন্যানো সার প্রয়োগে তা প্রায় ২৪ মণ হতে পারে। কৃষক পর্যায়ে এ সার চালু হলে উৎপাদন ব্যয় কমবে বলে মনে করেন তিনি।

আরডিএ বগুড়ার মহাপরিচালক ড. মো. আব্দুল মজিদ প্রামাণিক বলেন, কৃষক পর্যায়ে ন্যানো ফার্টিলাইজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা যাচাইয়ে আরডিএর মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা চলমান রয়েছে। গবেষণার ফলাফল সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে।

আরডিএর উপপরিচালক ও ন্যানো ফার্টিলাইজার গবেষক ড. নূর মোহাম্মদ বলেন, ব্রি ধান-১০৩ জাতের ধানে ন্যানো ফার্টিলাইজার প্রয়োগে প্রচলিত রাসায়নিক সারের তুলনায় কম খরচে বেশি ফলন পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। ধানের পাশাপাশি সবজি, ভুট্টাসহ অন্যান্য ফসলেও এর কার্যকারিতা যাচাই করা হবে। আগামী মৌসুমেও মাঠপর্যায়ের গবেষণা অব্যাহত থাকবে।

বিজ্ঞাপন

আরডিএর যুগ্ম পরিচালক রেবেকা সুলতানা বলেন, মাঠপর্যায়ে ন্যানো ফার্টিলাইজার সম্প্রসারণের জন্য একটি বড় প্রকল্প গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। গবেষণায় আশানুরূপ ফল পাওয়া গেলে প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের জমিতে প্রদর্শনী ও পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করা হবে। কৃষকদের কাছে প্রযুক্তিটি পরিচিত করার পাশাপাশি দেশে বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।

তথ্য সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৬৯ লাখ মেট্রিক টন রাসায়নিক সারের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে দেশে উৎপাদিত হয় প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন। বাকি ৫৪ লাখ মেট্রিক টন আমদানি করতে হয়। এতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। এই আমদানিনির্ভরতা কমানোর সম্ভাব্য উপায় হিসেবে ন্যানো ফার্টিলাইজার নিয়ে গবেষণা করছে আরডিএ।

উল্লেখ্য, অধ্যাপক ড. মো. জাবেদ হোসেন খানের উদ্ভাবিত ন্যানো ইউরিয়া সার গত ২৫ অক্টোবর বাংলাদেশ পেটেন্ট অফিসের অনুমোদন পেয়েছে।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD