জমিদারের কাচারি ঘরে ভূমি অফিস, বৃষ্টিতে ভিজছে সরকারি নথি

একসময় জমিদারের প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের কাজে ব্যবহৃত হতো যে কাচারি ঘর, বর্তমানে সেখানেই চলছে ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কার্যক্রম। তবে পুরোনো সেই ভবনটি এখন জরাজীর্ণ অবস্থায়। দেয়ালে ফাটল, খসে পড়ছে পলেস্তারা, টিনের ছিদ্র দিয়ে বৃষ্টির পানি ঢুকে ভিজছে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কাগজপত্র।
বিজ্ঞাপন
নথি সংরক্ষণের স্টোররুমে রয়েছে বাদুড়ের বসবাস। মেঝেতে বাদুড়ের বিষ্ঠা ও দুর্গন্ধে কক্ষটি ব্যবহারের অনুপযোগী। নলকূপ অকেজো, শৌচাগারও জরাজীর্ণ। এর সঙ্গে রয়েছে প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতি। সব মিলিয়ে নানা সমস্যার মধ্যেই চলছে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার গয়াবাড়ি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কার্যক্রম।
সরেজমিনে দেখা যায়, গয়াবাড়ি স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাশের পুকুরের পূর্বদিকে একটি ছোট টিনশেড ভবনে ভূমি অফিসটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভবনটি একসময় জমিদার সুমেরু গিরির ছেলে আশুতোষ গিরির খাজনা আদায়ের কাচারি ঘর ছিল। ঐতিহাসিক সেই ভবনেই এখন আধুনিক ভূমিসেবা প্রদানের দাপ্তরিক কার্যক্রম চলছে।
ভবনটিতে রয়েছে তিনটি ছোট কক্ষ। একটি ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার কার্যালয়, অন্যটি দাপ্তরিক কাজের জন্য এবং তৃতীয়টি সরকারি নথিপত্র সংরক্ষণের স্টোররুম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে কক্ষগুলোর অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। দেয়ালের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দিয়েছে, কোথাও খসে পড়ছে পলেস্তারা। টিনের ছাদ ও কাঠের কাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত। বৃষ্টি হলেই ছাদের ছিদ্র ও ফাঁক দিয়ে পানি প্রবেশ করে ভিজে যায় সরকারি নথিপত্র। এতে গুরুত্বপূর্ণ দলিল-দস্তাবেজ এবং অফিসের আসবাবপত্রের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিশেষ করে নথিপত্র রাখার স্টোররুমটির অবস্থা সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। সরকারি কাগজপত্র সংরক্ষণের জন্য নির্ধারিত কক্ষটি এখন বাদুড়ের আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে। মেঝেতে ছড়িয়ে রয়েছে বাদুড়ের বিষ্ঠা। দুর্গন্ধে কক্ষটির পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিসংক্রান্ত নথি কতটা সুরক্ষিত রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অফিসের প্রবেশপথের পাশে থাকা শৌচাগারটিও জরাজীর্ণ। এর দরজা এতটাই দুর্বল যে সামান্য ধাক্কায় খুলে যায়। পাশে থাকা নলকূপটি দীর্ঘদিন ধরে অকেজো। ফলে পানির প্রয়োজন মেটাতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশের পুকুরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অফিসে সরকারি জেনারেটর থাকলেও জ্বালানি বরাদ্দ না থাকায় সেটি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।
বিজ্ঞাপন
অবকাঠামোগত সমস্যার পাশাপাশি জনবলসংকটও অফিসটির কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে। স্বাভাবিকভাবে দাপ্তরিক কাজ পরিচালনার জন্য অন্তত পাঁচজন কর্মচারী প্রয়োজন হলেও বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র তিনজন। তাঁরা হলেন ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা রায়হান কবির, জারীকারক শামসুন্নাহার এবং অফিস সহায়ক ইমরান হোসেন।
ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা রায়হান কবির সপ্তাহে তিন দিন গয়াবাড়ি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালন করেন। বাকি দুই দিন তাঁকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে পাশের খালিশা চালানী ইউনিয়ন ভূমি অফিসে কাজ করতে হয়। ফলে গয়াবাড়ি অফিসে সপ্তাহের প্রতিদিন তাঁর উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে ভূমিসেবা নিতে আসা মানুষ অনেক সময় প্রয়োজনীয় কর্মকর্তা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
দক্ষিণ গয়াবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা হাজরত আলী জানান, এর আগে দুইবার অফিসে এসে তহশিলদারকে না পেয়ে ফিরে গেছি। তৃতীয়বার এসে দুপুর ১২টার দিকে তাঁকে পেয়েছি। তিনি আমাকে ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ দেওয়ার কথা বলেছেন।
বিজ্ঞাপন
কর্মকর্তার অনুপস্থিতির পাশাপাশি ভূমিসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা পেতেও দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ রয়েছে। পশ্চিম খড়িবাড়ি গ্রামের খলিলুর রহমান জানান, সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে নামজারি খতিয়ান সৃজনের জন্য আবেদন করেছিলেন। এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন পাওয়ার কথা থাকলেও দেড় মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন পাঠানো হয়নি। এতে তাঁকে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা হুমায়ুন কবির বলেন, দীর্ঘদিন ধরে গয়াবাড়ি ইউনিয়ন ভূমি অফিসটির এমন বেহাল অবস্থা। বৃষ্টি হলে ছাদ দিয়ে পানি পড়ে, দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ে। এ পরিবেশে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজ করতেও সমস্যা হয়। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। দ্রুত ভবনটি সংস্কার অথবা নতুন ভবন নির্মাণ করা প্রয়োজন।
আরেক বাসিন্দা শ্রী পরিমল চন্দ্র রায় বলেন, ভূমিসংক্রান্ত কাজে অফিসে এলে অনেক সময় প্রয়োজনীয় কর্মকর্তাকে পাওয়া যায় না। জনবল কম থাকায় কাজ শেষ করতেও দেরি হয়। এতে সাধারণ মানুষকে বারবার অফিসে আসতে হয় এবং সময় ও অর্থের অপচয় হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত জনবলসংকট নিরসন করে সেবার মান উন্নত করা।
বিজ্ঞাপন
ভবনটির দুরবস্থা ও জনবলসংকটের বিষয়টি স্বীকার করেছেন গয়াবাড়ি ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা রায়হান কবির। তিনি বলেন, ভবনটির দেয়াল থেকে প্রতিদিনই পলেস্তারা খসে পড়ছে। বিভিন্ন স্থানে ফাটল ধরেছে। বৃষ্টি হলে টিনের ছাদ দিয়ে পানি পড়ে এবং দাপ্তরিক কাগজপত্র ভিজে যায়। নলকূপটি দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট থাকায় পানি পাওয়া যায় না। পাশের পুকুর থেকে পানি এনে ব্যবহার করতে হয়। এ ছাড়া স্বাভাবিকভাবে অফিস পরিচালনার জন্য অন্তত পাঁচজন কর্মচারী প্রয়োজন হলেও বর্তমানে রয়েছেন মাত্র তিনজন। জনবলসংকটের কারণে প্রত্যাশিত সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
এ বিষয়ে ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, ইউনিয়ন ভূমি অফিসগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নে সরকার পর্যায়ক্রমে নতুন ভবন নির্মাণ করছে। গয়াবাড়ি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ছাড়া জনবলসংকট নিরসনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
জমিদারি আমলের কাচারি ঘর থেকে আধুনিক ইউনিয়ন ভূমি অফিসে রূপান্তরিত হলেও গয়াবাড়ির এই প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও কর্মপরিবেশে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। অথচ এখান থেকেই স্থানীয় মানুষের জমির মালিকানা, ভূমি উন্নয়ন কর ও নামজারিসহ গুরুত্বপূর্ণ সেবা পাওয়ার কথা। বর্তমানে সেই অফিসের সরকারি নথিপত্রই বৃষ্টির পানিতে ভিজছে।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ভবন সংস্কার অথবা নতুন ভবন নির্মাণ, নিরাপদ নথি সংরক্ষণ, সুপেয় পানির ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের মাধ্যমে গয়াবাড়ি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের দুরবস্থা কাটিয়ে তুলবে। এতে ভূমিসেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে এবং দাপ্তরিক কার্যক্রমে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসবে।








