ঢাবিতে ১ টাকা জরিমানা দিতেও ব্যাংকে দৌড়াতে হয় শিক্ষার্থীদের

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ও বিজ্ঞান পাঠাগারে বই ফেরত দিতে নির্ধারিত সময় পার হলে জরিমানা দিতে হয় শিক্ষার্থীদের। জরিমানার পরিমাণ মাত্র ১ টাকা হলেও সেই অর্থ জমা দিতে যেতে হয় ব্যাংকে। নির্দিষ্ট ফরম পূরণ করে ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার দীর্ঘদিনের এই নিয়মকে অযৌক্তিক ও ভোগান্তিকর বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা।
বিজ্ঞাপন
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নাবিলা হকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্টের মাধ্যমে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। বই ফেরত দিতে আট থেকে নয় দিন দেরি হওয়ায় তাকে ১ টাকা জরিমানা করা হয়। সেই অর্থ জমা দেওয়ার জন্য তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) এলাকার জনতা ব্যাংকে যেতে বলা হয়।
জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের অধীনেই পরিচালিত হয় বিজ্ঞান পাঠাগার। বই ফেরত দিতে দেরি হলে জরিমানা আদায়ের জন্য শিক্ষার্থীদের একটি নির্ধারিত ফরম দেওয়া হয়। সেখানে শিক্ষার্থীর পরিচয় এবং জরিমানার পরিমাণ উল্লেখ থাকে। সেই ফরম অনুযায়ী ব্যাংকে অর্থ জমা দিতে হয়।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তবে জরিমানার পরিমাণ নিয়ে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ওয়েবসাইটেই রয়েছে ভিন্ন তথ্য। ওয়েবসাইটের ‘ফাইন ডিটেইলস’ অংশে বলা হয়েছে, প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে ৫০ পয়সা, তৃতীয় ও চতুর্থ সপ্তাহে ১ টাকা এবং পঞ্চম সপ্তাহ থেকে ৩ টাকা জরিমানা দিতে হবে।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে, গ্রন্থাগারের অধ্যাদেশভিত্তিক নীতিমালার ১৪ নম্বর বিধিতে প্রতি বইয়ের জন্য প্রতি সপ্তাহ বা সপ্তাহের অংশবিশেষের বিপরীতে ২৫ পয়সা জরিমানার বিধান রয়েছে। সেখানে জরিমানার অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব দপ্তরে নগদে জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
বর্তমানে কোন নিয়ম কার্যকর রয়েছে এবং জরিমানা আদায়ের পদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না, সে বিষয়ে ওয়েবসাইটে সুস্পষ্ট তথ্য নেই।
এক টাকার জন্য ব্যাংকে গিয়ে ভোগান্তি
বিজ্ঞাপন
জরিমানা দেওয়া শিক্ষার্থী নাবিলা হক জানান, পূজার ছুটির মধ্যে বই ফেরতের নির্ধারিত তারিখ পড়ায় তিনি সময়মতো বই জমা দিতে পারেননি। এ কারণে তাকে জরিমানা গুনতে হয়েছে। তার ভাষায়, ‘এক টাকার জন্য ব্যাংকের দিকে যাওয়াটাই বিরক্তিকর।’
কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে নিয়মিত পড়াশোনা করেন শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মোস্তাকিম। তার মতে, জরিমানা পরিশোধের পদ্ধতিটি অনলাইনভিত্তিক করা হলে শিক্ষার্থীদের সময় ও শ্রম দুটোই বাঁচবে।
তিনি বলেন, মাত্র ১ টাকা জরিমানা দিতে ব্যাংকে যাওয়া এবং লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি ভোগান্তি। বিশ্ববিদ্যালয় চাইলে সহজেই অনলাইন লেনদেনের ব্যবস্থা চালু করতে পারে।
বিজ্ঞাপন
৪০-৫০ বছরের পুরোনো নিয়ম
ব্যাংকের মাধ্যমে মাত্র ১ টাকা জরিমানা জমা দেওয়ার প্রচলিত পদ্ধতিকে অযৌক্তিক বলে স্বীকার করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ভারপ্রাপ্ত গ্রন্থাগারিক অধ্যাপক কাজী মোস্তাক গাউসুল হক।
তিনি জানান, প্রায় ৪০ থেকে ৫০ বছর বা তারও আগে থেকে এ নিয়ম চলে আসছে। বর্তমানে ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ জমা দেওয়াই জরিমানা পরিশোধের একমাত্র পদ্ধতি। তবে অল্প পরিমাণ অর্থ জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা চালু করা যায় কি না, তা নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
কিউআর কোডে জরিমানা পরিশোধের পরিকল্পনা
পুরোনো পদ্ধতি পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের আর্থিক লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ায় গ্রন্থাগারের জরিমানার অর্থও একইভাবে জমা দিতে হয়। অল্প পরিমাণ অর্থ জমা দেওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, সেটি একধরনের শাস্তি হিসেবেও কাজ করে। এতে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে বই ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে সময়ানুবর্তী হওয়ার বিষয়ে সতর্ক হন।
বিজ্ঞাপন
তবে এ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সেবা অনলাইনভিত্তিক করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিক্ষার্থীরা যাতে কিউআর কোড স্ক্যান করে সহজেই জরিমানার অর্থ পরিশোধ করতে পারেন, সে বিষয়েও কাজ করবে প্রশাসন।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ১৩ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও হলের জামানতসহ বিভিন্ন ফি অনলাইনে অথবা সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে জমা দিতে পারবেন। ব্যাংকের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর ভোগান্তি কমাতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আর্থিক সেবায় অনলাইন লেনদেনের সুযোগ চালু হলেও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের জরিমানা আদায়ের ক্ষেত্রে এখনো রয়ে গেছে কয়েক দশক আগের পদ্ধতি। ফলে সামান্য ১ টাকা জমা দিতেও ব্যাংকে ছুটতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।








