চাকরি না পাওয়ার ক্ষোভে যেভাবে রাজপথে নেমেছে ঝাড়খণ্ডের তরুণরা

ভারতের ঝাড়খণ্ডে সরকারি চাকরির নিয়োগে অনিয়ম, প্রশ্নপত্র ফাঁস, স্বচ্ছতার অভাব এবং দীর্ঘদিনের বেকারত্বের অভিযোগ ঘিরে রাজপথে নেমেছেন হাজারো তরুণ-তরুণী। বছরের পর বছর বিভিন্ন সরকারি চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিয়েও কাঙ্ক্ষিত নিয়োগ না পাওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে। তাদের অভিযোগ, পরীক্ষার ফল প্রকাশ থেকে শুরু করে নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
গত ২৫ জুলাই থেকে রাঁচিতে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ক্রমেই বড় আকার ধারণ করেছে। আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি—সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়াকে দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ করা এবং পরীক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগের যথাযথ তদন্ত করা।
বাবার আন্দোলনের ফলেই তৈরি হয়েছিল ঝাড়খণ্ড
চাকরিপ্রার্থী কৃষ্ণ দেবের বয়স প্রায় ৩৫ বছর। সরকারি চাকরির আশায় গত এক দশকে একাধিকবার ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (জেপিএসসি) পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন তিনি। কিন্তু এখনো চাকরি পাননি।
বিজ্ঞাপন
কৃষক বাবার সন্তান কৃষ্ণ দেবকে তার বাবা একসময় বলেছিলেন, ঝাড়খণ্ড আলাদা রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য তারা যে লড়াই করেছিলেন, সেটি ছিল নতুন প্রজন্মের অধিকারের জন্য। এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার দায়িত্ব তরুণদেরই নিতে হবে।
কৃষ্ণ দেবের বাবা ঝাড়খণ্ডকে পৃথক রাজ্য করার দীর্ঘ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিহারের দক্ষিণাঞ্চলে আদিবাসীদের স্বতন্ত্র পরিচয় ও পৃথক রাজনৈতিক অস্তিত্বের দাবিতে কয়েক দশকের আন্দোলনের পর ২০০০ সালে বিহার ভাগ হয়ে ঝাড়খণ্ড রাজ্যের জন্ম হয়।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
আন্দোলনে অংশগ্রহণের স্বীকৃতি হিসেবে কৃষ্ণ দেবের বাবা বর্তমানে মাসে প্রায় সাড়ে তিন হাজার রুপি পেনশন পান।
কিন্তু বাবার লড়াইয়ের ফল হিসেবে পাওয়া পৃথক রাজ্যেই নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন ছেলে। রাঁচিতে বিধানসভা ঘেরাও কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে কৃষ্ণ দেব অভিযোগ করেন, ঝাড়খণ্ড প্রতিষ্ঠার পর থেকে সরকারি চাকরির বিভিন্ন পরীক্ষাকে ঘিরে বারবার অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
তার দাবি, প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষার খাতায় অসঙ্গতি এবং চাকরি বেচাকেনার মতো অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।
বিজ্ঞাপন
ফল প্রকাশেও স্বচ্ছতা চান চাকরিপ্রার্থীরা
চাকরিপ্রার্থীদের অন্যতম অভিযোগ, পরীক্ষার ফল প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ করা হয় না।
কৃষ্ণ দেবের ভাষায়, অনেক সময় শুধু রোল নম্বরের তালিকা প্রকাশ করা হয়। কিন্তু পরীক্ষায় কাটঅফ নম্বর কত ছিল, কারা নিয়োগের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং নির্বাচিত প্রার্থীদের যোগ্যতার মানদণ্ড কী—এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায় না।
বিজ্ঞাপন
এ কারণে দীর্ঘদিন পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে বলে দাবি আন্দোলনকারীদের।
তাদের অভিযোগ, সরকারি চাকরির জন্য লক্ষাধিক তরুণ প্রতিযোগিতায় অংশ নিলেও নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। ফলে পরীক্ষার প্রস্তুতির পেছনে বছরের পর বছর সময় ব্যয় করেও অনেকেই কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারছেন না।
‘চাকরি না পেলে বাবার পেশায় ফিরতে হবে?’
বিজ্ঞাপন
আন্দোলনে অংশ নেওয়া আরেক চাকরিপ্রার্থী অশোক কুমার পিঠে ভারতের জাতীয় পতাকা নিয়ে মিছিলে অংশ নেন। তার পরিবার এতটাই আর্থিক সংকটে রয়েছে যে এখনো মাটির বাড়িতেই বসবাস করতে হয় বলে জানান তিনি।
দীর্ঘদিন ধরে সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নেওয়ার পরও নিয়োগ না পেলে শেষ পর্যন্ত বাবার মতো কৃষিকাজে ফিরে যেতে হবে কি না—এমন প্রশ্নও তাকে ভাবিয়ে তুলছে।
অশোকের অভিযোগ, অন্য রাজ্য থেকে আসা প্রার্থীরাও ঝাড়খণ্ডের সরকারি চাকরিতে সুযোগ পাচ্ছেন। বিশেষ করে রাজ্যের আঞ্চলিক বিষয়সংক্রান্ত পরীক্ষায় বাইরের প্রার্থীরা কীভাবে স্থানীয়দের চেয়ে বেশি নম্বর পাচ্ছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
তার যুক্তি, ঝাড়খণ্ড প্রশাসনের বড় একটি অংশকে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সমস্যা ও স্থানীয় বাস্তবতা নিয়ে কাজ করতে হয়। তাই স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে যারা বেশি জানেন, নিয়োগে তাদের সুযোগ পাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
লাঠি-জলকামানেও থামেনি বিক্ষোভ
সরকারি চাকরির নিয়োগ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে রাঁচির রাজপথে নামা তরুণদের আন্দোলনে একদিকে যেমন ছিল ক্ষোভ, অন্যদিকে দেখা গেছে ব্যতিক্রমী প্রাণচাঞ্চল্যও।
বিজ্ঞাপন
বিধানসভা ঘেরাও কর্মসূচিতে পুলিশ ব্যারিকেড দিলে আন্দোলনকারীদের কেউ কেউ সেটি তুলে নিয়ে মাথায় করে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করলে অনেক বিক্ষোভকারী সেই পানিতে ভিজেই নাচতে শুরু করেন।
কেউ কেউ মজা করে পুলিশ সদস্যদের কাছে আরও পানি দেওয়ার অনুরোধও করেন। এতে পরিস্থিতির উত্তেজনার মধ্যেও কিছুটা হাস্যরস তৈরি হয়।
কর্মরত কয়েকজন নারী পুলিশ সদস্যও ব্যক্তিগতভাবে জানান, তাদের নিজেদের সন্তানরাও সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ফলে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত অনুভূতির দ্বন্দ্বও তাদের মধ্যে কাজ করছে।
বিজ্ঞাপন
বেকারত্বের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে বিয়ের চাপ
আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণীদের কাছে সরকারি চাকরি শুধু আর্থিক নিরাপত্তার বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত ভবিষ্যৎ স্বাধীনতা ও সামাজিক চাপও।
২৬ বছর বয়সী আয়ুষা আনুষা ও তার বোন সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের বক্তব্য, পরিবার শুরুতে মেয়েদের চাকরির প্রস্তুতিতে সহযোগিতা করলেও কয়েক বছর পেরিয়ে গেলে বিয়ের জন্য চাপ তৈরি হয়।
আনুষার মতে, চাকরি না পাওয়ার কারণে শিক্ষিত তরুণীদের কর্মজীবনে প্রবেশের বয়স ক্রমেই পিছিয়ে যাচ্ছে। একইভাবে অনেক পুরুষ চাকরি না পাওয়ার কারণে বিয়ের ক্ষেত্রেও সমস্যায় পড়ছেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বছরের পর বছর পরীক্ষা দিয়ে বারবার নিয়োগ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় শিক্ষিত বেকার তরুণ-তরুণীদের বয়স বাড়ছে, অথচ কর্মজীবনে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না।
অনশনে পাঁচজন, কয়েকজন হাসপাতালে
চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনের অংশ হিসেবে পাঁচজন আমরণ অনশনে বসেছেন। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মী দেবেন্দ্র নাথ মাহাতোসহ কয়েকজনের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে।

দেবেন্দ্র নাথ মাহাতো রাঁচি কেন্দ্র থেকে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন। গত ২ আগস্ট থেকে তিনি অনশন করছেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় বিধানসভা ঘেরাও কর্মসূচির পর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
রাঁচির জয়পাল সিং মুণ্ডা স্টেডিয়ামেও আন্দোলনকারীদের দুটি আলাদা অবস্থান কর্মসূচি চলছে। একটি শিবিরে রাজনৈতিক পরিচয় থাকা নেতাকর্মীরা রয়েছেন। অন্যদিকে ‘জেপিএসসি-জেএসএসসি রিফর্মস মঞ্চ’-এর আন্দোলনকারীরা নিজেদের অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরেছেন।
আন্দোলনকারীদের পাশে খাবার ও গান নিয়ে সাধারণ মানুষ
আন্দোলন দীর্ঘ হওয়ায় বিক্ষোভকারীদের জন্য খাবারের ব্যবস্থাও করছেন বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন। প্রতিদিনই কোনো না কোনো শুভাকাঙ্ক্ষী তাদের দুপুরের খাবার সরবরাহ করছেন।
একদিন একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষ থেকে ভাত, ডাল, সয়াবিন ও ভাজি দেওয়া হয়। সংগঠনটির সদস্যরা জানান, শিক্ষাব্যবস্থা ও তরুণদের অধিকার নিয়ে যারা আন্দোলন করছেন, তাদের পাশে দাঁড়ানোই তাদের উদ্দেশ্য।
এমনকি কয়েকজন কলেজপড়ুয়া তরুণীও নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী আন্দোলনকারীদের জন্য খাবার নিয়ে আসেন। তাদের একজন জানান, ভবিষ্যতে তিনিও চাকরির পরীক্ষায় অংশ নেবেন। তাই বর্তমানে যারা নিয়োগ সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করছেন, তাদের লড়াইকে নিজের ভবিষ্যতের সঙ্গেও সম্পর্কিত মনে করেন তিনি।
আন্দোলনস্থলে শুধু খাবার নয়, চলছে গানও। আদিবাসী লোকশিল্পীদের একটি দল নাগপুরি ভাষার গান, ঢোল ও বাঁশির মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের উৎসাহ দিচ্ছে।

লোকশিল্পী রামচন্দ্র রাম জানান, তরুণদের মানসিক শক্তি ধরে রাখতেই তারা সেখানে গান পরিবেশন করছেন। দেশাত্মবোধক গান ও শহীদদের স্মরণে গানও পরিবেশন করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
‘একটি চাকরিই আমাদের স্বপ্ন’
অনশনকারীদের একজন উম্মে হাবিবা নিজেকে একজন কৃষকের মেয়ে হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তার পরিবারে আর্থিক সামর্থ্য সীমিত। বাবা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ এবং ভাইয়েরা দিনমজুর হিসেবে কাজ করেন বলে তিনি জানান।
তার বক্তব্য, উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের মতো বিদেশে গিয়ে পড়াশোনা করার সুযোগ তাদের নেই। পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তনের জন্য একটি সরকারি চাকরিই তার কাছে বড় স্বপ্ন।
আরও পড়ুন
তিনি বলেন, চাকরি পেলে শুধু নিজের ভবিষ্যৎ নয়, বাবা-মায়ের মুখও উজ্জ্বল হবে এবং সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করার সুযোগ তৈরি হবে।
হাবিবার অভিযোগ, সরকারি চাকরির প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বারবার অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় তার মতো অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়ছেন। দীর্ঘ প্রস্তুতির পরও নিয়োগ না পাওয়ায় হতাশা ক্রমেই বাড়ছে।
ঝাড়খণ্ডের বর্তমান আন্দোলন তাই শুধু কয়েকটি পরীক্ষার সংস্কারের দাবি নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা, পারিবারিক প্রত্যাশা এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা। পৃথক রাজ্যের জন্য যে প্রজন্ম একসময় রাস্তায় নেমেছিল, তাদের উত্তরসূরিরাই এখন নতুন রাজ্যে স্বচ্ছ নিয়োগ ও কর্মসংস্থানের অধিকারের দাবিতে রাজপথে অবস্থান করছেন।
তথ্য সূত্র: বিবিসি বাংলা








