Logo

চীনের অর্থনীতিকে বদলে দেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝুর মৃত্যু

profile picture
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১২ আগস্ট, ২০২৬, ১৮:৪৭
চীনের অর্থনীতিকে বদলে দেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝুর মৃত্যু
ছবি: সংগৃহীত

চীনের অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনে দেশটিকে ‘বিশ্বের কারখানা’ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজি মারা গেছেন। বুধবার (১২ আগস্ট) রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর।

বিজ্ঞাপন

চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, স্থানীয় সময় বুধবার সকাল ১১টার দিকে বেইজিংয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঝু রংজি মারা যান।

১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত চীনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ঝু। এর আগে ১৯৯০-এর দশকে উপপ্রধানমন্ত্রী থাকাকালে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দক্ষ ও লাভজনক করার উদ্যোগ এবং চীনের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) যোগদানের প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে অর্থনৈতিক সংস্কারক হিসেবে পরিচিতি পান তিনি।

ঝুর নেওয়া বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ চীনের অর্থনীতিকে দ্রুত এগিয়ে নিতে সহায়তা করে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ চাকরি হারালেও দীর্ঘমেয়াদে শিল্প ও অর্থনীতির দক্ষতা বাড়ে। পরবর্তী সময়ে চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার পথেও এগিয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

সাবেক নেতা দেং শিয়াওপিংয়ের ১৯৭৯ সালের অর্থনৈতিক সংস্কারকে আরও এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তার নেতৃত্বে চীন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগ দেওয়ার পথ সুগম করে। ২০০১ সালের ডিসেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে ডব্লিউটিওর সদস্য হয় দেশটি। এর ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যে চীনের অংশগ্রহণ আরও বাড়ে এবং দেশটির রপ্তানি খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হয়।

২০০০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে চীনের বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের বেশি ছিল। ২০০৭ সালে দেশটির প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছায়।

বিজ্ঞাপন

কঠোর কর্মপদ্ধতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থানের কারণে ঝু সাধারণ মানুষের কাছেও জনপ্রিয় ছিলেন। সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যর্থতার সমালোচনা করার পাশাপাশি সরকারের ভুলের দায় নিজে নেওয়ার নজিরও তৈরি করেছিলেন তিনি। কঠোর স্বভাবের কারণে তাকে ‘বস’ এবং ‘পাগলা ঝু’ নামেও ডাকা হতো।

১৯৯০-এর দশকে উপপ্রধানমন্ত্রী থাকাকালে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মূল্য নিয়ন্ত্রণ বিধি কার্যকর করেন ঝু। পাশাপাশি লোকসানে থাকা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঋণ দেওয়া বন্ধ করেন। স্থানীয় পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরোধিতা উপেক্ষা করেও তিনি এসব সংস্কার বাস্তবায়নে এগিয়ে যান।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

চীনের অর্থনৈতিক সংস্কারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন। তবে ঝু পুরোপুরি বেসরকারীকরণের পক্ষে ছিলেন না। বরং ব্যাংক, বিমান সংস্থা, তেল কোম্পানি ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে সরকারি মালিকানায় রেখেই মুনাফামুখী ও দক্ষ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার পরিকল্পনা করেন।

১৯৯৮ সালে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আবাসন বিক্রির উদ্যোগের মাধ্যমে চীনে ব্যক্তিগত আবাসন খাতের প্রসারেও ভূমিকা রাখেন ঝু। এক দশকের মধ্যে শহরাঞ্চলের বড় অংশের আবাসন ব্যক্তিমালিকানায় চলে যায়।

বিজ্ঞাপন

১৯২৮ সালের ২৩ অক্টোবর চীনের হুনান প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন ঝু রংজি। কর্মজীবনের শুরুতে অর্থনৈতিক পরিকল্পনাবিদ হিসেবে কাজ করেন তিনি। ১৯৫৭ সালে হাঙ্গেরি ও যুগোস্লাভিয়ার অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রশংসা করায় তাকে ‘ডানপন্থী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর ফলে প্রায় ২২ বছর তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার স্থবির হয়ে পড়ে।

১৯৬৬ থেকে ১৯৭৬ সালের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় তাকে গ্রামে পাঠিয়ে শারীরিক শ্রমে নিয়োজিত করা হয়। ১৯৭৯ সালে পুনর্বাসনের পর দ্রুত রাজনৈতিক উত্থান ঘটে তার। ১৯৮৭ সালে সাংহাইয়ের ডেপুটি পার্টি সেক্রেটারি এবং ১৯৮৮ সালে মেয়র হন ঝু।

১৯৮৯ সালে সাংহাইয়ের মেয়র থাকাকালে বিক্ষোভের পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে তুলনামূলক সংযত ভূমিকার জন্য প্রশংসিত হন তিনি। পরে ১৯৯১ সালে উপপ্রধানমন্ত্রী এবং ১৯৯৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী স্থায়ী কমিটির সদস্য হন।

বিজ্ঞাপন

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সরকারি ব্যর্থতার দায় স্বীকার করার ঘটনাও তাকে আলোচনায় এনেছিল। ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় ৪ হাজার ১৫০ জনের মৃত্যু হলে বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। পরে দক্ষিণ চীনের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিস্ফোরণে ৪২ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার জন্য জাতীয় টেলিভিশনে ক্ষমাও চান।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

ঝু রংজি নিজের বক্তব্যে রসবোধেরও পরিচয় দিতেন। ১৯৯৯ সালের এক সংবাদ সম্মেলনে নিজের একটি ছবি দেখিয়ে নিজেকে নিয়ে রসিকতা করলে উপস্থিতদের মধ্যে হাসির সৃষ্টি হয়।

বিজ্ঞাপন

উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার অন্যতম উল্লেখযোগ্য সাফল্য ছিল এমন একটি করব্যবস্থা চালু করা, যার মাধ্যমে স্থানীয় সরকারের রাজস্বের বড় অংশ কেন্দ্রীয় সরকারের তহবিলে জমা হতো। এর ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হয়।

প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর ঝু রংজি জনসমক্ষে খুব বেশি আসেননি। তবে চীনের অর্থনৈতিক সংস্কার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে দেশটির প্রবেশের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা দেশটির আধুনিক অর্থনীতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে।

সূত্র: এপি, এনসিবিসি নিউজ

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD