দক্ষিণ লেবাননে আগুন, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অগ্নিসংযোগের অভিযোগ

দক্ষিণ লেবাননে ইচ্ছাকৃতভাবে দাবানল সৃষ্টি করার অভিযোগ উঠেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে। স্থানীয় বাসিন্দা ও দমকলকর্মীদের দাবি, ইসরায়েলি বাহিনীর বোমা ও ড্রোন হামলার কারণে ওই অঞ্চলের বনাঞ্চল, জলপাইবাগান ও কৃষিজমিতে একের পর এক আগুন ছড়িয়ে পড়ছে।
বিজ্ঞাপন
বুধবার (১২ আগস্ট) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব অভিযোগের কথা উঠে এসেছে। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই লেবাননের প্রাকৃতিক পরিবেশকে ইসরায়েলি হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক দাবানলও সেই ধারাবাহিকতার অংশ বলে মনে করছেন তারা।
নাবাতিয়েহ অঞ্চলের বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রধান হুসেইন ফাকিহ জানান, মঙ্গলবার দক্ষিণ লেবাননের খিয়ামের কাছে একটি বনাঞ্চলে ইসরায়েলি বাহিনীর ফ্লেয়ার নিক্ষেপের পর আগুন ছড়িয়ে পড়ে। দমকলকর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর কাছাকাছি এলাকায় ড্রোন হামলা চালানো হলে নিরাপত্তার কারণে তাদের সরে আসতে হয়।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
ফাকিহ বলেন, বর্তমানে তাদের বেশিরভাগ উদ্ধার তৎপরতার লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে আগুন নিয়ন্ত্রণ। এরই মধ্যে বিশাল বনাঞ্চল পুড়ে গেছে। সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও সম্মুখসারির কাছাকাছি এলাকার প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ জমি আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
যুদ্ধবিরতির পরও আগুন
গত ১৭ জুন হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি হলেও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রায় দুই মাস ধরে ওই অঞ্চলে প্রায় প্রতিদিনই আগুন ও দাবানলের ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে জলপাইবাগান ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে স্থানীয় দমকলকর্মী ও বাসিন্দারা জানিয়েছেন।
ফাকিহের অভিযোগ, যুদ্ধবিরতির পর থেকেই এসব ঘটনা শুরু হয়েছে। তার দাবি, প্রতিদিন অগ্নিসংযোগকারী গোলাবারুদ ব্যবহার করা হচ্ছে। ছোট ড্রোনের মাধ্যমে দাহ্য পদার্থ ফেলা হচ্ছে এবং বনাঞ্চলে সাদা ফসফরাসের গোলা ও আলোকসৃষ্টিকারী ফ্লেয়ার ব্যবহার করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
দাবানলের বিষয়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দক্ষিণ লেবাননের অন্য এলাকার বাসিন্দা ও দমকলকর্মীরাও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। শুক্রবার কাফারচৌবা এবং জেজিন ও পশ্চিম বেকা উপত্যকার মধ্যবর্তী দুটি ঘন বনাঞ্চলে গোলাবারুদের কারণে বড় ধরনের আগুন ছড়িয়ে পড়ে বলে দাবি করা হয়েছে।
কাফারচৌবার বেসামরিক প্রতিরক্ষা কেন্দ্রের প্রধান সামির হারদান জানান, শুক্রবার বিকেলে একটি ড্রোন বনাঞ্চলে গোলাবারুদ নিক্ষেপ করলে আগুনের সূত্রপাত হয়। শনিবার আগুন নেভানোর পর রোববার একই এলাকায় আরেকটি ড্রোনের মাধ্যমে আবার আগুন লাগানো হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
আগুন নেভাতেও বাধা
দমকলকর্মীদের আগুন নেভানোর আগে লেবাননের সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়। এরপর সেনাবাহিনী ইসরায়েলি বাহিনী ও সংঘাত এড়ানোর সমন্বয়কারী দলের কাছে অনুমতির আবেদন পাঠায়। তবে আগুন নেভানোর জন্য মাত্র দুটি এলাকায় যাওয়ার অনুমতি মিলেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে অন্যান্য এলাকায় আগুন জ্বললেও সেখানে দমকলকর্মীরা পৌঁছাতে পারেননি।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব আগুন দক্ষিণ লেবাননের বনাঞ্চল ও জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করছে। পরিবেশ সংরক্ষণ সংগঠন গ্রিন সাদার্নার্সের প্রতিষ্ঠাতা হিশাম ইউনেস বলেন, এসব এলাকায় দীর্ঘদিনের ওক বন রয়েছে। পাশাপাশি উচ্চফলনশীল স্টোন পাইন গাছও রয়েছে। পরিযায়ী পাখিদের চলাচল ও বিশ্রামের জন্যও অঞ্চলটি গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
ইউনেস এসব কর্মকাণ্ডকে ‘পরিবেশহত্যা’ হিসেবে উল্লেখ করে দাবি করেন, গোলাবারুদ, আগুন ও রাসায়নিক ব্যবহারের মাধ্যমে দক্ষিণ লেবাননের পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের ওপর ধারাবাহিকভাবে আঘাত করা হচ্ছে।
আগেও বনাঞ্চলে হামলার অভিযোগ
২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর সংঘাত শুরুর পর থেকেই ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননের বনাঞ্চলকে বারবার লক্ষ্যবস্তু করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি, হিজবুল্লাহ তাদের যোদ্ধা ও সুড়ঙ্গ আড়াল করতে এসব বনাঞ্চল ব্যবহার করে। তবে পরিবেশবাদী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, বনাঞ্চল ধ্বংসের প্রভাব বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপরও পড়বে।
বিজ্ঞাপন
২০২৪ সালের গ্রীষ্মে ইসরায়েলি সেনারা মধ্যযুগীয় নিক্ষেপযন্ত্র ‘ট্রেবুশে’ ব্যবহার করে লেবাননের সীমান্ত দেয়ালের ওপর দিয়ে জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ নিক্ষেপ করেছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। একই সময়ে লেবাননের সেনাবাহিনী কয়েকটি ইসরায়েলি ড্রোনের ছবি প্রকাশ করে, যেগুলোতে বনাঞ্চলে দাহ্য পদার্থ ছড়ানোর জন্য পাইপ যুক্ত থাকার দাবি করা হয়।
এ ছাড়া ফেব্রুয়ারিতে স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করেন, ইসরায়েলি উড়োজাহাজ দক্ষিণ লেবাননের কৃষিজমিতে আগাছানাশক ছড়িয়েছে। ওই রাসায়নিকের সঙ্গে ক্যানসারের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ রয়েছে বলেও তারা সতর্ক করেছিলেন।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
গত ১ আগস্ট সীমান্তবর্তী ইয়ারুন গ্রামের বাস্তুচ্যুত বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, ইসরায়েলি সেনারা তাদের বাড়িঘর, জলপাইবাগান ও ফলের বাগানে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। সীমান্তের কাছের রমেইচ ও আইন এবেলের বাসিন্দারাও আগুনের ছবি পাঠিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
ইয়ারুনের মেয়র হাফেজ ঘাশামের দাবি, প্রথমে পুরো গ্রাম বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর অবশিষ্ট গাছগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। বিশেষ করে বহু পুরোনো জলপাইগাছ থাকা এলাকায় আগুন দেওয়ার পর তা ধীরে ধীরে গ্রামের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান








