ইসরায়েলে সরকার গঠন নিয়ে অচলাবস্থা, সামনে খোলা আছে ৫ পথ

ইসরায়েলের ২০২৬ সালের নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পরও সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। ১২০ আসনের পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। কিন্তু কোনো পক্ষই এককভাবে সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে নতুন সরকার গঠন নিয়ে কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস ধরে রাজনৈতিক আলোচনা চলতে পারে।
বিজ্ঞাপন
নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি ও উগ্র ডানপন্থি জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। তাঁর দল লিকুদ ২৭টি আসন নিয়ে পার্লামেন্টের বৃহত্তম দল হয়েছে। অন্যদিকে মধ্যপন্থি গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন।
চূড়ান্ত ফলাফলে আরব দল রা’আম ও জয়েন্ট লিস্টের গুরুত্বও বেড়েছে। দল দুটি সম্মিলিতভাবে পেয়েছে ১৯টি আসন। সরকার গঠনের সমীকরণে তাদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
নির্বাচনের ফলাফলে সরকার গঠনের আলোচনা জটিল হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিভাজনের কারণে সহজে কোনো জোট গঠন সম্ভব হচ্ছে না। তবে আগামী কয়েক সপ্তাহের আলোচনায় কয়েকটি সম্ভাব্য পথ তৈরি হতে পারে। এমনকি এক বছরের বেশি টিকবে না—এমন দুর্বল সরকারও গঠিত হতে পারে। আগামী ১২ সপ্তাহের মধ্যে কোনো সমঝোতা না হলে ইসরায়েলিদের আবারও ভোট দিতে হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটানোর সম্ভাব্য পাঁচটি পথ হলো—
১. নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যের সরকার
লিকুদ সবচেয়ে বড় দল হওয়ায় নেতানিয়াহু মধ্যপন্থি ও ডানপন্থি বিরোধী দলগুলোকে নিয়ে সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারেন। এ ধরনের জোটে গাদি আইজেনকটের ইয়াশার, আভিগদর লিবারম্যানের ইসরায়েল আওয়ার হোম এবং নাফতালি বেনেটের টুগেদার গোষ্ঠী যুক্ত হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
এই দলগুলো একসঙ্গে হলে পার্লামেন্টে তাদের আসনসংখ্যা দাঁড়াবে ৬৬। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন সম্ভব হবে।
তবে আপাতত এ সম্ভাবনা কম। কারণ, এমন সরকার গঠন করতে হলে নেতানিয়াহুকে তাঁর স্বাভাবিক রাজনৈতিক মিত্র উগ্র ডানপন্থি ও কট্টর অর্থোডক্স ইহুদি দলগুলোকে ছেড়ে আসতে হবে।
অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোকেও নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রধান প্রতিশ্রুতি ভাঙতে হবে। তারা ভোটারদের কাছে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর অঙ্গীকার করেছিল। তবে কয়েক সপ্তাহের দীর্ঘ আলোচনার পরও কোনো পক্ষ সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে শেষ উপায় হিসেবে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠিত হতে পারে। ইরানের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধ বা অন্য কোনো পক্ষের সঙ্গে সংঘাতও দুই শিবিরকে একসঙ্গে আসতে বাধ্য করতে পারে।
বিজ্ঞাপন
২. নেতানিয়াহুর সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগির সরকার
আরেকটি সম্ভাবনা হলো, নেতানিয়াহু ও আইজেনকটের শিবির পালাক্রমে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করবে। তবে নির্বাচনে বৃহত্তম দল ও বড় রাজনৈতিক জোটের নেতা হিসেবে দুই দিক থেকেই এগিয়ে থাকায় নেতানিয়াহু এমন ক্ষমতা ভাগাভাগির প্রস্তাবে রাজি হবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
এ ধরনের সমঝোতা হলে আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন পরিবর্তনপন্থি শিবিরের নেতাদের আবারও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভাঙতে হবে এবং নেতানিয়াহুর অধীনে সরকারে কাজ করতে হবে।
বিজ্ঞাপন
৩. বিরোধী জোটে ভাঙন ধরিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেন নেতানিয়াহু
নির্বাচনের সর্বশেষ ফল অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর জোটের আসনসংখ্যা আগের ৬৪ থেকে কমে ৫৩ হয়েছে। তবে ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালন করা এই প্রধানমন্ত্রীকে দেশটির দক্ষ রাজনীতিকদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তিনি বিরোধী দলগুলোর কয়েকজন সদস্যকে নিজের পক্ষে টেনে এনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করতে পারেন। অতীতেও তিনি এমন কৌশল নিয়েছেন। ২০২২ সালের নির্বাচনের আগে বিরোধী জোটে ভাঙন ধরিয়ে তিনি ক্ষমতায় ফিরেছিলেন।
বিজ্ঞাপন
তবে তখন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল তুলনামূলকভাবে কম। ফলে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করতে খুব বেশি সদস্যকে নিজেদের দলে টানার প্রয়োজন হয়নি।
৪. আইজেনকটের নেতৃত্বে সংখ্যালঘু সরকার
প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ যদি প্রথমে আইজেনকটকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেন, তাহলে তিনি নিজের স্বাভাবিক মিত্রদের নিয়ে সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে ইয়াশার, টুগেদার, ডেমোক্র্যাটস ও ইসরায়েল আওয়ার হোম একসঙ্গে আসতে পারে।
বিজ্ঞাপন
এই জোটকে বাইরে থেকে সমর্থন দিতে পারে আরব দল রা’আম ও জয়েন্ট লিস্ট। আইজেনকটের শিবিরের ৪৮টি আসনের সঙ্গে আরব দল দুটির ১৯টি আসন যোগ হলে মোট আসনসংখ্যা দাঁড়াবে ৬৭।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তবে আরব দলগুলোর সমর্থন গ্রহণ করাও আইজেনকটের জন্য সহজ হবে না। নির্বাচনের আগে তিনি আরব দলগুলোকে সরকারে না রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অন্যদিকে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েলের আরব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী সম্পর্কে অনেক ইসরায়েলির মনোভাব আরও কঠোর হয়েছে।
নেতানিয়াহুও নির্বাচনী প্রচারে আরব দলগুলোর সমর্থনকে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে তুলে ধরেছেন। এখন পর্যন্ত মধ্য-বামপন্থি দল ডেমোক্র্যাটসই প্রকাশ্যে আরব দলগুলোকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তবে রা’আম ও জয়েন্ট লিস্ট—দুই দলই আইজেনকটের শিবিরের সঙ্গে সহযোগিতা করতে আগ্রহের ইঙ্গিত দিয়েছে।
২০২১ সালে নাফতালি বেনেটের সরকারে যোগ দিয়েছিল রা’আম। ইসরায়েলের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো স্বতন্ত্র আরব দল সরকারে অংশ নিয়েছিল। তবে ওই সরকার ১৮ মাসের মাথায় ভেঙে পড়ে।
৫. আবারও নির্বাচন
সরকার গঠনের কোনো পথ খুঁজে পাওয়া না গেলে ইসরায়েলে আবারও নির্বাচন হতে পারে।
আগামী সপ্তাহে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করবেন। এরপর যাকে সরকার গঠনের সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় মনে করবেন, তাঁকে দায়িত্ব দেবেন।
প্রথম ব্যক্তি ব্যর্থ হলে অন্য কেউ সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারবেন। তিনিও ব্যর্থ হলে পার্লামেন্টের সদস্যরা অন্য কাউকে মনোনীত করতে পারবেন। পুরো প্রক্রিয়ার জন্য প্রায় ১০০ দিনের সময়সীমা রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে কেউ সরকার গঠন করতে না পারলে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
তবে হারজগ চলতি সপ্তাহেই বলেছেন, আরেকটি নির্বাচন এড়াতে সম্ভাব্য সবকিছু করতে হবে। এ লক্ষ্যে দলগুলোকে তাঁর সঙ্গে আলোচনায় খোলা মন নিয়ে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সূত্র: এনডিটিভি








