সংবিধান থেকে বাদ পড়তে পারে শেখ মুজিবের ‘জাতির পিতা’ স্বীকৃতি

সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাবনায় বড় ধরনের পরিবর্তনের আলোচনা চলছে। এর মধ্যে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধে অবদানের বিষয়টি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে দেওয়া সাংবিধানিক স্বীকৃতি বাদ দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে। একই সঙ্গে ৭ মার্চের ভাষণ, ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা বাতিলের বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠককে কেন্দ্র করেই এসব প্রস্তাব সামনে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
প্রস্তাবিত পরিবর্তনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান পুনর্বহালের বিষয়টিও রয়েছে। পাশাপাশি ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন এবং জুলাই যোদ্ধাদের অবদানের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
জানা গেছে, জুলাই সনদকে সামনে রেখে সংবিধানে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা চালু, একজন ব্যক্তির দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী না হওয়ার বিধান, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানো, একাধিক ডেপুটি স্পিকার নিয়োগ এবং সংসদে নারী সদস্যদের আসন বাড়ানোর মতো প্রস্তাবও বিবেচনায় রয়েছে। নৈতিক অপরাধে অভিযুক্ত সংসদ সদস্যদের সদস্যপদ বাতিলের জন্য নতুন বিধান যুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় জাতীয় সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক হয়। কমিটির সভাপতি ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ এতে সভাপতিত্ব করেন। বৈঠকে পরিচিতিপর্বের পাশাপাশি সংবিধানের কোন কোন অংশে সংশোধন আনা হবে, তা নিয়ে আলোচনা হয়।
বিশেষ করে পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে উচ্চ আদালতের রায় এবং জুলাই সনদের আলোকে বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আদালতের রায়ের আলোকে সংবিধানের প্রথম ভাগের ৪-এর (ক), ৭-এর ১ (ক) ও (খ), ৭-এর ২ ও ৩, ৭-এর (খ) এবং ৪৪ (২) অনুচ্ছেদ বাদ দেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত করা তফসিলগুলোর মধ্যে পঞ্চম ও ষষ্ঠ তফসিলও বাদ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। পঞ্চম তফসিলে শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ এবং ষষ্ঠ তফসিলে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি সম্পর্কিত দ্বিতীয় ভাগের ৮-এর ১ অনুচ্ছেদেও পরিবর্তনের আলোচনা চলছে। জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার পাশাপাশি ৯ অনুচ্ছেদে থাকা ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-এর পরিবর্তে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ শব্দ ব্যবহারের প্রস্তাবও বিবেচনায় রয়েছে।
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের প্রথম ভাগের ৪-এর (ক) অনুচ্ছেদে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও প্রধান বিচারপতির কার্যালয়সহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসে সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা যুক্ত করা হয়েছিল। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে এই বিধান বাদ দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের বিধান বহাল রাখার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়। এর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্ত করা, গণভোটের বিধান বাতিলসহ বিভিন্ন পরিবর্তন করা হয়েছিল।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলসংক্রান্ত সংশোধনীকে অসাংবিধানিক ও মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে উচ্চ আদালত রায় দেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের ফলে নির্বাচনব্যবস্থায় দলীয় প্রভাব বাড়ে এবং গণতন্ত্র ও জনগণের সার্বভৌমত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আদালত পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত করা ৭-এর (ক), ৭-এর (খ) এবং ৪৪ (২) অনুচ্ছেদও বাতিল ঘোষণা করেন। ৪৪ (২) অনুচ্ছেদকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল হওয়া গণভোটের বিধান পুনর্বহালের বিষয়েও আদালতের রায়ে উল্লেখ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধান সংশোধন কমিটি সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাবনায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান পুনর্বহালের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণভাবে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে ১৯৭২ সালের সংবিধানে থাকা রাষ্ট্র পরিচালনার চার মূলনীতি এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার বিধান বহাল রাখা হবে কি না, তা নিয়েও কমিটিতে মতামত দেওয়ার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্যতা সংক্রান্ত বিধান নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন শেষ হওয়ার দুই দিন আগে গত ১৩ জুলাই সংবিধান সংশোধনের জন্য ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। সালাহউদ্দিন আহমদকে কমিটির সভাপতি করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি সংসদে কমিটির সদস্যদের নাম উপস্থাপন করেন। পরে কণ্ঠভোটে তা অনুমোদন পায়। শুরুতে ১৭ সদস্যের কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিরোধী দল সদস্যদের নাম না দেওয়ায় ১২ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।
বিজ্ঞাপন
বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি পদ খালি রাখা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস কমিটিতে তাদের প্রতিনিধির নাম দেয়নি।








