Logo

আ. লীগের মিছিল ঠেকাতে ব্যর্থ হলে দায় নিতে হবে ওসি-ডিসিকে

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৩:৫১
আ. লীগের মিছিল ঠেকাতে ব্যর্থ হলে দায় নিতে হবে ওসি-ডিসিকে
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের আকস্মিক মিছিল ও জমায়েত ঠেকাতে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের আরও সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। কোনো থানা এলাকায় নিষিদ্ধ দলটির নেতা-কর্মীদের মিছিল বা অপতৎপরতা ঘটলে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-পুলিশ কমিশনারকে (ডিসি) জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।

বিজ্ঞাপন

সোমবার (১৪ ডিসেম্বর) ডিএমপির মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভা বা ক্রাইম কনফারেন্সে এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। সভায় বলা হয়েছে, ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর অভিযান চালানোই পুলিশের একমাত্র দায়িত্ব নয়। সম্ভাব্য মিছিল, জমায়েত কিংবা নাশকতার বিষয়ে আগাম তথ্য সংগ্রহ করে তা প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

সভায় রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে ব্যবস্থা না নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকার প্রবেশপথ, গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও রাতের চেকপোস্টে নজরদারি বাড়ানো, ভাড়াটিয়াদের তথ্য যাচাই এবং স্থানীয় পর্যায়ে কমিউনিটি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করার কথা বলা হয়েছে।

ডিএমপির একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ। এতে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার, যুগ্ম কমিশনার, ক্রাইম বিভাগের ডিসি এবং রাজধানীর ৫০ থানার ওসিরা উপস্থিত ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

সভায় আগস্ট মাসে রাজধানীতে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের পরিস্থিতি পর্যালোচনার পাশাপাশি সামনের দিনগুলোতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের করণীয় নিয়ে আলোচনা করা হয়।

গুলশানের মিছিল নিয়ে আলোচনা

সম্প্রতি গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ঝটিকা মিছিলের বিষয়টি সভায় বিশেষ গুরুত্ব পায়। ডিএমপির গোয়েন্দা গুলশান বিভাগের ডিসি আ ফ ম আনোয়ার হোসেন খান বলেন, ঘটনাটি নিয়ে সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তবে ওই ঘটনায় নির্দিষ্ট কোনও পুলিশ কর্মকর্তাকে এককভাবে দায়ী করা হয়নি।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, কোথায় তথ্যের ঘাটতি ছিল, কেন আগাম প্রস্তুতি আরও কার্যকর করা সম্ভব হয়নি এবং ভবিষ্যতে কীভাবে এ ধরনের ঘটনা ঠেকানো যায়—এসব বিষয় পর্যালোচনা করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বাইরে থেকে লোকজন এসে যাতে ঢাকায় কোনো ধরনের অপতৎপরতা চালাতে না পারে, সেজন্য প্রবেশপথগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও রাতের চেকপোস্টে ব্লক চেকসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতেও বলা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সভায় জানানো হয়, গুলশানের ওই মিছিলের বিষয়ে পুলিশ মাত্র আট মিনিট আগে একটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে তথ্য পেয়েছিল। তথ্য পাওয়ার পরই গুলশান থানা পুলিশ তৎপর হয়। তবে এত অল্প সময়ে বড় জমায়েত ঠেকানোর ক্ষেত্রে পুলিশের প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতাও আলোচনায় আসে।

ওসি-ডিসির ওপর থাকবে প্রাথমিক দায়িত্ব

সভায় স্পষ্ট করা হয়, নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিল বা কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে শুধু গোয়েন্দা সংস্থার ওপর দায় চাপিয়ে দায়িত্ব এড়ানো যাবে না। সংশ্লিষ্ট থানার ওসি এবং জোনের ডিসিকে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক দায়িত্ব নিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

কোনো কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে বা অপারেশনাল ঘাটতি দেখা দিলে তাকে জবাবদিহির আওতায় আনার কথাও জানানো হয়।

ক্রাইম ডিভিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, কমিশনার স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোনো ইউনিট বা কর্মকর্তা কার্যকরভাবে কাজ করতে না পারলে সেখানে পরিবর্তন আনা হবে। দায়িত্বে গাফিলতি কিংবা অপেশাদার আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না।

মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে কমিশনার বলেছেন, ‘যে জায়গায় কাজ হবে না, সেই জায়গায় পরিবর্তন’।

বিজ্ঞাপন

গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে জোর

গুলশানের ঘটনার পর গোয়েন্দা সমন্বয়ের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। শুধু পুলিশের নিজস্ব তথ্যের ওপর নির্ভর না করে ডিজিএফআই, এনএসআই, সিটিএসবি ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কোনো মিছিল, জমায়েত বা নাশকতার সম্ভাব্য তথ্য পাওয়া গেলে তা দ্রুত মাঠপর্যায়ের সংশ্লিষ্ট ইউনিটকে জানিয়ে আগাম ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

একই সঙ্গে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল ঠেকানোর নামে নিরপরাধ ব্যক্তিদের হয়রানি না করার নির্দেশ রয়েছে। শুধু অতীতে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বা সমর্থনের পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে গ্রেপ্তার করা যাবে না।

মিছিলে সরাসরি অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে ছবি, ভিডিও ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণসহ সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ব্যবহার করতে বলা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এক থানার ওসি বলেন, মিছিলে সরাসরি সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শুধু রাজনৈতিক পরিচয় বা সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে আটক করে হয়রানি করা যাবে না। একই সঙ্গে গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে কোনো পুলিশ সদস্য আর্থিক সুবিধা নিলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।

অপরাধের আগেই প্রতিরোধের নির্দেশ

ক্রাইম কনফারেন্সে ‘প্রিভেন্টিভ পুলিশিং’ বা অপরাধ সংঘটনের আগেই তা ঠেকানোর কৌশলের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। কর্মকর্তাদের আগাম তথ্য সংগ্রহ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা এবং সম্ভাব্য অপরাধীদের গতিবিধি নজরদারির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রাজধানীর আবাসিক ও অন্যান্য হোটেলে অবস্থানকারী অতিথিদের তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ ও সংরক্ষণের নির্দেশও দিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার।

তেজগাঁও বিভাগের এক এডিসি বলেন, নতুন ভাড়াটিয়ার তথ্য যাচাইয়ের পাশাপাশি পুরোনো ভাড়াটিয়াদের তথ্যও হালনাগাদ করতে বলা হয়েছে। সন্দেহজনক সাবলেট, অস্থায়ী আবাস এবং নতুন করে ঢাকায় আসা ব্যক্তিদের বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কমিউনিটি পুলিশিংয়ের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ওসিদের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তি, কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সদস্য ও স্থানীয় নাগরিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে বলা হয়েছে। নতুন বা অপরিচিত ব্যক্তির আনাগোনা কিংবা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড দেখা গেলে স্থানীয়রা যাতে দ্রুত থানায় তথ্য দিতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

থানায় ওসিদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার নির্দেশ

থানায় ওসিদের নিয়মিত উপস্থিতির বিষয়েও সভায় কঠোর বার্তা দেওয়া হয়। সম্প্রতি তেজগাঁও থানায় পরিদর্শনে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ওসিকে না পাওয়ার ঘটনা এবং পল্টন থানায় আইজিপি আলী হোসেন ফকির ও ডিএমপি কমিশনার ওসিকে না পাওয়ার বিষয়টি সভায় আলোচিত হয়।

এরপর তেজগাঁও থানার ওসি ক্যশৈন্যু মারমা এবং পল্টন মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খানকে প্রত্যাহার করা হয়।

এক যুগ্ম কমিশনার পদমর্যাদার কর্মকর্তা বলেন, এসব ঘটনার পর থানায় ওসিদের উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনের বিষয়ে আরও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ডিউটির সময়ে ওসিদের থানায় অবস্থান করে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নির্ধারিত পোশাক পরতে বলা হয়েছে।

আরও পড়ুন

জরুরি প্রয়োজনে থানার বাইরে যেতে হলে জিডিতে বিষয়টি উল্লেখ করে দায়িত্ব পরবর্তী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশও রয়েছে।

থানার পরিবেশ ও পুলিশ সদস্যদের শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দায়িত্বে গাফিলতি, বিশৃঙ্খলা বা অপেশাদার আচরণ ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে বলে জানানো হয়েছে।

ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধেও অভিযান

ক্রাইম কনফারেন্সে ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়। এলাকাভিত্তিক দায়িত্ব ভাগ করে পুলিশ সদস্যদের ডিউটি করার পাশাপাশি কোনো এলাকায় যাতে নিরাপত্তার শূন্যতা তৈরি না হয়, সেদিকে নজর দিতে বলা হয়েছে।

অপরাধপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে নিয়মিত টহল ও নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

সভায় জানানো হয়, গুলশানের ঘটনায় ডিবি ও থানা পুলিশের সমন্বিত অভিযানে ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ঢাকার বাইরে থেকে আসা ব্যক্তিও রয়েছেন।

কর্মকর্তারা জানান, বগুড়া, গোপালগঞ্জ, আলফাডাঙ্গা ও হরিরামপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা কয়েকজন ঢাকায় বিভিন্ন পেশায় যুক্ত ছিলেন। একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টের পাঁচজন ওয়েটারকে গ্রেপ্তারের তথ্যও সভায় দেওয়া হয়। পাশাপাশি নিরাপত্তাকর্মী ও অটোরিকশাচালকের মতো বিভিন্ন পেশার আড়ালে থাকা ব্যক্তিদেরও শনাক্ত করার কথা বলা হয়েছে।

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD