Logo

রাজনৈতিক পালাবদলের মুখে জামায়াতের ক্ষমতায় আসা কতটা বাস্তব?

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২১ জানুয়ারি, ২০২৬, ১৭:৪৭
রাজনৈতিক পালাবদলের মুখে জামায়াতের ক্ষমতায় আসা কতটা বাস্তব?
ছবি: সংগৃহীত

ফরিদপুরের ৪৫ বছর বয়সী ব্যাংক কর্মকর্তা আবদুর রাজ্জাকের কণ্ঠে এখন স্পষ্ট আত্মবিশ্বাস। নিজ এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে প্রচারণায় নেমে তিনি বলছেন, যাদের সঙ্গেই কথা হচ্ছে, তারা একত্রিতভাবেই জামায়াতকে ভোট দিতে আগ্রহী। তাঁর বিশ্বাস, এবারের নির্বাচনে দলটির জন্য রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার একটি বাস্তব সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এটিই দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। ওই আন্দোলনের পর নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে। ফলে নির্বাচনের মাঠে মূল প্রতিযোগিতা গড়ে উঠেছে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন একটি জোটের মধ্যে। এই জোটে যুক্ত হয়েছে ২০২৪ সালের আন্দোলনের ছাত্রনেতাদের গড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ কয়েকটি ইসলামপন্থী দল।

জামায়াতের প্রতি রাজ্জাকের আশাবাদের পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক জনমত জরিপ। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের ডিসেম্বরের জরিপে দেখা যায়, বিএনপির সমর্থন ৩৩ শতাংশ আর জামায়াতের ২৯ শতাংশ। এর পর গত সপ্তাহে দেশীয় চারটি সংস্থার যৌথ জরিপে বিএনপি পেয়েছে ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং জামায়াত ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশ সমর্থন। এই ব্যবধান জামায়াতকে কার্যত বিএনপির খুব কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

যদি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট বিজয়ী হয়, তবে তা হবে দলটির ইতিহাসে এক নাটকীয় প্রত্যাবর্তন। শেখ হাসিনার টানা ১৫ বছরের শাসনামলে দলটি নিষিদ্ধ ছিল, শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি বা দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং হাজারো নেতা-কর্মী গুম, নিখোঁজ বা হেফাজতে মৃত্যুর শিকার হন। এই দমননীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল ২০১০ সালে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, যেখানে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন অপরাধের অভিযোগে জামায়াত নেতাদের বিচার করা হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো তখন এই বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ বলে অভিহিত করেছিল।

পরিস্থিতির এক অদ্ভুত মোড় হলো, সেই একই ট্রাইব্যুনাল গত নভেম্বরে ২০২৪ সালের আন্দোলনে বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়নের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। আন্দোলনের সময় দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যাওয়া শেখ হাসিনাকে ফেরত আনার অনুরোধ জানিয়েও সফল হয়নি অন্তর্বর্তী সরকার।

জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শাসনে মানুষ ক্লান্ত। তাঁর ভাষায়, জনগণ নতুন রাজনৈতিক শক্তির সন্ধান করছে। একই কথা বলছেন রাজ্জাকও। তিনি দাবি করেন, অতীতে জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের ওপর চালানো নির্যাতন মানুষ ভুলে যায়নি। এখন সেই সহানুভূতিই ভোটে রূপ নিতে পারে।

বিজ্ঞাপন

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৪১ সালে ব্রিটিশশাসিত ভারতে ইসলামী চিন্তাবিদ সৈয়দ আবুল আলা মওদুদীর হাতে গড়ে ওঠা জামায়াত একটি আঞ্চলিক ইসলামী আন্দোলন থেকে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নেয়। তবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় দলটি স্বাধীনতার পরপরই নিষিদ্ধ হয়। ১৯৭৯ সালে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর বিএনপির সঙ্গে জোট করে জামায়াত আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হয় এবং ২০০১ সালে সরকারে অংশ নিয়ে দুটি মন্ত্রণালয়ও পায়।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর মাধ্যমে জামায়াতের রাজনৈতিক পতন ঘটে। শীর্ষ নেতাদের ফাঁসির মধ্য দিয়ে দলটি কার্যত নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে। তবে ২০২৪ সালের আন্দোলনের পর নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ায় বর্তমান আমির শফিকুর রহমানসহ নতুন নেতৃত্বে দলটি আবার সংগঠিত হয় এবং নির্বাচনী মাঠে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে হাজির হয়।

বিজ্ঞাপন

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন আদর্শিক দ্বন্দ্বের চেয়ে শাসনব্যবস্থার প্রশ্নে নির্ধারিত হবে। অধ্যাপক ড. মুশতাক খানের মতে, এটি ইসলাম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতার লড়াই নয়; বরং সংস্কার বনাম স্থিতাবস্থার প্রতিযোগিতা। যে পক্ষ বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার ও স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি দিতে পারবে, তারই সুবিধা হবে।

জামায়াত নেতারা বলছেন, তাদের উত্থান কেবল দমননীতির প্রতি সহানুভূতির ফল নয়; বরং প্রতিষ্ঠিত রাজনীতির প্রতি ব্যাপক হতাশার প্রতিফলন। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার পর তৈরি হওয়া রাজনৈতিক শূন্যতায় তারা দ্রুত নিজেদের প্রধান বিকল্প হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছে। সাম্প্রতিক ছাত্র সংসদ নির্বাচনে শিবিরের সাফল্যও তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।

তবে আশঙ্কাও রয়েছে। অনেকের মতে, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে নারী অধিকার বা ব্যক্তিস্বাধীনতা সংকুচিত হতে পারে। এই অভিযোগ নাকচ করে দলটির দাবি, তারা সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই সংস্কার ও সুশাসনের রাজনীতি করবে। এমনকি সংখ্যালঘু ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে এবার তারা প্রথমবারের মতো হিন্দু প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরাও সতর্ক অবস্থানে। তাঁদের মতে, জামায়াত ভালো ফল করলেও ক্ষমতায় যাওয়া সহজ হবে না। অতীত ইতিহাস, নীতি ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নির্বাচনের ফলাফল নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।

সব মিলিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি দীর্ঘদিন বিতর্কে থাকা একটি রাজনৈতিক শক্তির জন্য জাতীয় গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের পরীক্ষাও। ভোটের রায়ই ঠিক করে দেবে—বাংলাদেশ কি সত্যিই এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে, নাকি পুরোনো ধারার মধ্যেই সমাধান খুঁজবে।

জেবি/এএস
Logo

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ

মোঃ শফিকুল ইসলাম ( শফিক )

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ৫৭, ময়মনসিংহ লেন, ২০ লিংক রোড, বাংলামটর, ঢাকা-১০০০।

ফোনঃ 02-44615293

ই-মেইলঃ dailyjanobaninews@gmail.com; dailyjanobaniad@gmail.com

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD