Logo

কোটি বছর আগে কি সাপের পা ছিল?

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২৯ জুলাই, ২০২৬, ১৪:৪৮
কোটি বছর আগে কি সাপের পা ছিল?
ছবি: সংগৃহীত

সাপের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে লম্বা, পা-বিহীন এক সরীসৃপের ছবি। অথচ পা না থাকলেও তারা অনায়াসে দ্রুতগতিতে চলতে পারে, গাছে উঠতে পারে, পানিতে সাঁতার কাটতে পারে, এমনকি সংকীর্ণ গর্তেও সহজে প্রবেশ করতে সক্ষম। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—সাপ কি সবসময়ই পা-বিহীন ছিল, নাকি কোটি কোটি বছর আগে তাদেরও পা ছিল?

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের গবেষণা বলছে, আধুনিক সাপের পূর্বপুরুষদের পা ছিল। বিবর্তনের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে ধীরে ধীরে সেই পা বিলীন হয়ে যায়। জীবাশ্ম, জিনগত বিশ্লেষণ এবং আধুনিক গবেষণা—সবকিছু মিলিয়ে এ বিষয়ে শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।

জীবাশ্মে মিলেছে পায়ের অস্তিত্ব

বিশ্বখ্যাত বৈজ্ঞানিক সাময়িকী Nature, Scientific American এবং Science Advances-এ প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, প্রায় ১০ থেকে ১২ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে বসবাসকারী কিছু প্রাচীন সাপের পা ছিল।

বিজ্ঞাপন

এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলোর একটি হলো আর্জেন্টিনায় পাওয়া নাজাশ রিয়োনেগ্রিনা (Najash rionegrina) নামের একটি প্রাচীন সাপের জীবাশ্ম। গবেষকদের মতে, প্রায় ১০ কোটি বছর আগে বেঁচে থাকা এই সাপটির পেছনের দিকে দুটি ছোট কিন্তু স্পষ্ট পা ছিল।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

এ ছাড়া টেট্রাপোডোফিস (Tetrapodophis) নামে প্রায় ১২ কোটি বছর পুরোনো আরেকটি সরীসৃপের জীবাশ্ম নিয়েও বিজ্ঞানীদের আগ্রহ রয়েছে। এই প্রাণীটির চারটি পা ছিল। তবে এটি আদৌ প্রাচীন সাপ নাকি টিকটিকিজাতীয় কোনো সরীসৃপ—তা নিয়ে এখনো গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তবুও অধিকাংশ গবেষণার ফলাফল বলছে, সাপের বিবর্তনের শুরুটা হয়েছিল পা-যুক্ত সরীসৃপ থেকেই।

জিনের মধ্যেও লুকিয়ে আছে অতীতের গল্প

শুধু জীবাশ্ম নয়, আধুনিক জিনতত্ত্বও একই তথ্যের ইঙ্গিত দেয়। ২০১৬ সালে সাপের ভ্রূণ নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, আধুনিক সাপের শরীরে এখনো এমন কিছু জিন রয়েছে, যেগুলো একসময় পা তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে এসব জিন আগের মতো সক্রিয়ভাবে কাজ করে না।

বিজ্ঞাপন

১৯৯৯ সালে গবেষকরা প্রথম লক্ষ্য করেন, সাপের ভ্রূণে কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিন অন্যান্য সরীসৃপের তুলনায় ভিন্নভাবে কাজ করছে।

পরে গবেষণায় ‘সনিক হেজহগ’ (Sonic Hedgehog) নামে একটি জিনের গুরুত্ব সামনে আসে। এই জিন টিকটিকি ও অন্যান্য সরীসৃপের পা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

২০১৬ সালে অজগরের ভ্রূণ নিয়ে করা আরও একটি গবেষণায় দেখা যায়, এই জিনকে নিয়ন্ত্রণকারী কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ডিএনএ অংশ অনুপস্থিত। ফলে পা গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন ঠিকভাবে তৈরি হয় না এবং ভ্রূণের বিকাশের সময় পায়ের বৃদ্ধি থেমে যায়।

বিজ্ঞাপন

অজগরের শরীরে এখনো রয়েছে পায়ের চিহ্ন

বিস্ময়কর হলেও সত্য, আধুনিক কিছু সাপের শরীরে এখনো পূর্বপুরুষদের পায়ের ক্ষুদ্র চিহ্ন রয়ে গেছে।

বিশেষ করে অজগরের লেজের কাছাকাছি ‘স্পার্স’ (Spurs) নামে ছোট হাড়ের মতো অংশ দেখা যায়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এগুলো একসময়কার পেছনের পায়ের বিবর্তিত অবশিষ্টাংশ। এ ধরনের বৈশিষ্ট্য গবেষকদের কাছে সাপের বিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

বিজ্ঞাপন

কেন হারিয়ে গেল সাপের পা?

মানুষসহ অধিকাংশ প্রাণীর জন্য পা চলাফেরা, শিকার ধরা এবং শিকারির হাত থেকে বাঁচার অন্যতম প্রধান উপায়। তাহলে সাপ কেন তাদের পা হারাল?

বিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রাচীন সাপেরা এমন পরিবেশে বসবাস শুরু করেছিল যেখানে সরু গর্ত, পাথরের ফাঁক এবং মাটির নিচের সংকীর্ণ পথ দিয়ে চলাচল করতে হতো। এসব জায়গায় লম্বা ও নমনীয় শরীর পা-ওয়ালা দেহের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর ছিল।

বিজ্ঞাপন

ক্রমাগত প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে যেসব সাপের পা ছোট ছিল, তারা পরিবেশের সঙ্গে বেশি মানিয়ে নিতে সক্ষম হয়। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পা ছোট হতে হতে একসময় পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায়।

আজও পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী ব্লাইন্ড স্নেক বা অন্ধ সাপের মতো অনেক প্রজাতি জীবনের অধিকাংশ সময় মাটির নিচেই কাটায়, যা এই তত্ত্বকে আরও শক্তিশালী করে।

পা ছাড়াই কীভাবে চলে সাপ?

বিজ্ঞাপন

পা না থাকলেও সাপের শরীরের গঠন অত্যন্ত উন্নত। মানুষের মেরুদণ্ডে যেখানে প্রায় ৩৩টি কশেরুকা থাকে, সেখানে অধিকাংশ সাপের শরীরে ২০০ থেকে ৪০০টি কশেরুকা থাকে। প্রতিটি কশেরুকা শক্তিশালী পেশির মাধ্যমে সংযুক্ত থাকে, ফলে পুরো শরীরকে অত্যন্ত নমনীয়ভাবে বাঁকানো সম্ভব হয়।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

এ ছাড়া সাপের পেটের নিচের চওড়া আঁশ মাটির সঙ্গে ঘর্ষণ সৃষ্টি করে, যা তাকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।

পরিবেশ অনুযায়ী সাপ বিভিন্ন ধরনের চলার কৌশল ব্যবহার করে। এর মধ্যে রয়েছে— সাইডওয়েস ওয়েভিং—সবচেয়ে পরিচিত এস-আকৃতির আঁকাবাঁকা চলাচল; সাইডওয়াইন্ডিং—মরুভূমির বালুর ওপর দ্রুতগতির বিশেষ কৌশল; কনসার্টিনা মুভমেন্ট—গর্ত বা সংকীর্ণ স্থানে শরীর ভাঁজ করে এগিয়ে যাওয়া এবং রেকটিলিনিয়ার চলাচল—অজগরের মতো বড় সাপের ধীর কিন্তু স্থিতিশীলভাবে সামনে অগ্রসর হওয়ার পদ্ধতি।

এ ছাড়া অনেক সাপ দক্ষ সাঁতারু, কেউ গাছে চড়তে পারদর্শী, আবার কিছু প্রজাতি এক গাছ থেকে অন্য গাছে বাতাসে ভেসেও যেতে পারে।

বিবর্তনের এক অনন্য উদাহরণ

বিজ্ঞানীদের মতে, সাপের পা হারিয়ে যাওয়া কোনো দুর্বলতার লক্ষণ নয়। বরং এটি পরিবেশের সঙ্গে দীর্ঘ অভিযোজনের সফল ফল।

বর্তমানে অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সব মহাদেশেই সাপের দেখা মেলে। বন, পাহাড়, মরুভূমি, জলাভূমি, নদী এমনকি সমুদ্রেও রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির সাপ।

গবেষকদের মতে, সাপের বিবর্তনের ইতিহাস প্রমাণ করে যে, কোনো প্রাণীর টিকে থাকা শুধু শক্তিশালী অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ওপর নির্ভর করে না; বরং পরিবেশের সঙ্গে সবচেয়ে ভালোভাবে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাই দীর্ঘমেয়াদে একটি প্রজাতিকে সফল করে তোলে। কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের ধারায় সাপ সেই অভিযোজনেরই একটি অসাধারণ উদাহরণ।

তথ্য সূত্র: বিবিসি বাংলা

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD