Logo

উদ্বোধনের তিন মাসেই অচল থানচির ৪৯ লাখ টাকার পানি প্রকল্প

profile picture
উপজেলা প্রতিনিধি
থানচি, বান্দরবান
১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৩:৪৮
উদ্বোধনের তিন মাসেই অচল থানচির ৪৯ লাখ টাকার পানি প্রকল্প
ছবি: সংগৃহীত

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষের সুপেয় পানির সংকট দূর করতে প্রায় ৪৯ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা হয়েছিল পানি পরিশোধন ও সরবরাহ ব্যবস্থা। তবে উদ্বোধনের মাত্র তিন মাসের মধ্যেই অচল হয়ে পড়েছে বান্দরবানের থানচি উপজেলার বলিপাড়া ইউনিয়নের দিংতে পাড়ার প্রকল্পটি।

বিজ্ঞাপন

প্রায় নয় মাস ধরে পানি সরবরাহ বন্ধ থাকায় প্রকল্পের আওতাভুক্ত ৩৩টি পরিবারের ২০৫ জন বাসিন্দা ফের নিরাপদ পানির সংকটে পড়েছেন। সংশ্লিষ্টদের একাধিকবার বিষয়টি জানানো হলেও কার্যকর সমাধান না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের Local Government Initiative on Climate Change (LoGIC) Project-এর জলবায়ু সহনশীল স্কিমের আওতায় বাস্তবায়িত প্রকল্পটির নাম ‘জিএফএস-ভিত্তিক সৌরচালিত ভূপৃষ্ঠস্থ পানি পরিশোধন প্লান্ট স্থাপন ও সরবরাহ ব্যবস্থা’।

প্রকল্পের মোট বাজেট ৪৮ লাখ ৯১ হাজার ৯৭৬ টাকা। এর মধ্যে LoGIC প্রকল্পের PBCRG বরাদ্দ ৪১ লাখ ৯১ হাজার ৯৭৬ টাকা এবং কমিউনিটি কন্ট্রিবিউশন ৭ লাখ টাকা। PBCRG-এর বরাদ্দকাল ছিল ২০২৩-২৪ এবং প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ২০২৫-২৬।

বিজ্ঞাপন

প্রকল্পের আওতায় ঝিরি থেকে জিএফএস পানির লাইন, ১০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার সুপেয় পানির ব্যবস্থা, খাবার পানির জন্য দুটি সংগ্রহ পয়েন্ট, গৃহস্থালি ব্যবহারের জন্য চারটি পয়েন্ট, সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল, তিনতলা ফাউন্ডেশনের একটি পাকা কক্ষ এবং একটি সোলার স্ট্রিট লাইট স্থাপন করা হয়।

২০২৫ সালের ৫ অক্টোবর স্থানীয় সরকার বিভাগ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. রেজাউল মাকছুদ জাহেদী প্রকল্পটির উদ্বোধন করেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রকল্পটি চালুর পর প্রথমদিকে তারা স্বস্তি পেয়েছিলেন। দীর্ঘদিনের সুপেয় পানির সংকট অনেকটাই কমে এসেছিল। কিন্তু মাত্র তিন মাসের মধ্যেই প্লান্টটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে আগের মতো দূরের উৎস কিংবা পাহাড়ি ঝিরি থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে তাদের।

বিজ্ঞাপন

দিংতে পাড়ার বাসিন্দা পারাও ম্রো বলেন, “প্রকল্প চালু হওয়ার সময় মনে হয়েছিল আমাদের পানির কষ্ট শেষ হয়েছে। কিন্তু তিন মাস যেতে না যেতেই প্লান্ট বন্ধ হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছি, তারা মেরামত করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”

আরেক বাসিন্দা লংঙান ম্রো বলেন, “এত টাকা খরচ করে প্রকল্প করা হলো, অথচ কয়েক মাসও টিকল না। আমরা যদি আবারও পাহাড়ি ঝিরি বা দূরের উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করি, তাহলে এত টাকা ব্যয়ে প্রকল্প করার প্রয়োজন কী ছিল?”

LoGIC প্রকল্পের উপজেলা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুকেন্দু ত্রিপুরা বলেন, প্রকল্পটি অচল থাকার বিষয়টি তাদের জানানো হয়েছে। মূলত ইনভার্টার নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পানি ফিল্টারিং করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা চলছে এবং দ্রুত প্লান্ট সচল করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তবে LoGIC প্রকল্পের প্রকৌশলী করুনাময় চাকমার কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি বর্তমানে রাঙামাটিতে রয়েছেন এবং এ বিষয়ে বিস্তারিত জানেন না। পানি নিয়ে সমস্যা হয়ে থাকলে তা সমাধান করা যাবে বলেও জানান তিনি। প্রকল্পটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে উপজেলা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ভালো বলতে পারবেন বলে জানান এই প্রকৌশলী।

তবে প্রকল্প চালুর মাত্র তিন মাসের মধ্যে ত্রুটি দেখা দেওয়ার কারণ এবং নির্মাণ ও যন্ত্রপাতির মান যথাযথ ছিল কি না—এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেননি তিনি।

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটি বন্ধ থাকায় এর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, শুধু মেরামতের আশ্বাস দিলেই কি দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? দীর্ঘ নয় মাস ধরে পানি সরবরাহ বন্ধ থাকার পরও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—এ নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে তাদের।

এ বিষয়ে থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ-আল-ফয়সল বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন। প্রকল্পটি কেন অচল হয়েছে এবং বর্তমানে এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কার ওপর রয়েছে, তা সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জেনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জনগণের সুপেয় পানির মতো মৌলিক প্রয়োজনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে বলেও জানান তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি উন্নয়ন প্রকল্পের সাফল্য শুধু অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা উদ্বোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকল্পটি দীর্ঘদিন কার্যকর থাকা এবং প্রকৃত উপকারভোগীরা নিয়মিত সেবা পাচ্ছেন কি না, সেটিও সফলতার গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।

বিজ্ঞাপন

সে বিবেচনায় ৪৮ লাখ ৯১ হাজার ৯৭৬ টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রকল্পটি কেন চালুর কয়েক মাসের মধ্যেই অচল হলো, যন্ত্রপাতির মান ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না এবং প্রকল্প-পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কার—এসব বিষয় খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

তাদের দাবি, দ্রুত প্লান্টটি মেরামত করে পানি সরবরাহ চালু করার পাশাপাশি প্রকল্পটি অচল হওয়ার কারণও তদন্ত করা হোক। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে এমন প্রকল্প নির্মাণের পর অল্প সময়ের মধ্যেই অকার্যকর হয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD