Logo

জিও ব্যাগেও থামছে না তিস্তার ভাঙন, ৭ দিনে নিঃস্ব বহু পরিবার

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৫:৪১
জিও ব্যাগেও থামছে না তিস্তার ভাঙন, ৭ দিনে নিঃস্ব বহু পরিবার
ছবি: সংগৃহীত

উত্তরের পাঁচ জেলায় ভয়াবহ রূপ নিয়েছে তিস্তা নদীর ভাঙন। জিও ব্যাগ ও বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চললেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। গত সাত দিনে রংপুর, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও কুড়িগ্রামে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে ৩৮৬টি ঘরবাড়ি। বসতভিটা হারিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন অসংখ্য পরিবার।

বিজ্ঞাপন

পানি উন্নয়ন বোর্ডের রংপুর অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবীব জানিয়েছেন, পাঁচ জেলার ১১৩টি পয়েন্টে তিস্তার ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে।

তিনি বলেন, ভাঙন প্রতিরোধে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তিস্তার তীব্র স্রোতে প্রতিদিনই নদীতীরবর্তী এলাকার বসতবাড়ি বিলীন হচ্ছে। এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে নদীপাড়ের মানুষের মধ্যে। দীর্ঘদিনের বসতভিটা হারিয়ে অনেক পরিবার এখন কোথায় আশ্রয় নেবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

গাইবান্ধায় মুহূর্তেই নদীগর্ভে ঘরবাড়ি

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের সিংগীজানী ও ভোরের পাখি এলাকায় সম্প্রতি ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

বিজ্ঞাপন

তাদের ভাষ্য, কয়েক দিন ধরে তিস্তা নদীতে স্রোতের চাপ বাড়ছিল। একপর্যায়ে স্রোতের তীব্রতা বেড়ে নদীতীরবর্তী এলাকায় ভাঙন শুরু হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই নদীর পাড়ের মাটি ধসে পড়তে থাকে। এরপর একের পর এক বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।

ভাঙন এতটাই আকস্মিক ছিল যে অনেক পরিবার ঘরের আসবাবপত্র, ধান-চাল, কাপড়চোপড়সহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ার সুযোগও পায়নি। চোখের সামনে নিজেদের বসতভিটা ও ঘরবাড়ি নদীতে তলিয়ে যেতে দেখে অসহায় হয়ে পড়েন তারা।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই তিস্তার ভাঙনের সঙ্গে লড়াই করছেন তারা। কেউ একাধিকবার বসতভিটা পরিবর্তন করেছেন, আবার কেউ নদীর পাড়ে নতুন করে ঘর তৈরি করে বসবাস শুরু করেছেন। কিন্তু এবারের আকস্মিক ভাঙনে অনেকের শেষ আশ্রয়টুকুও নদীগর্ভে চলে গেছে।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম বলেন, হঠাৎ করেই নদীর পাড় ভাঙতে শুরু করে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘরবাড়ি নদীতে চলে যায়। ঘরের অনেক মালামাল বের করারও সুযোগ হয়নি।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের আরেক সদস্য আহাদ মিয়া বলেন, সারা জীবনের কষ্টে তৈরি করা ঘর চোখের সামনে নদীতে চলে গেছে। এখন কোথায় থাকবেন, কীভাবে পরিবার নিয়ে চলবেন, তা বুঝতে পারছেন না তিনি।

ভাঙনের কারণে বসতবাড়ির পাশাপাশি নদীতীরবর্তী ফসলি জমি, গাছপালা ও অন্যান্য স্থাপনাও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ভাঙন অব্যাহত থাকলে আরও অনেক পরিবার বসতভিটা হারাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

বিজ্ঞাপন

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে উপজেলা প্রশাসন

ভাঙনের খবর পেয়ে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঈফফাত জাহান তুলি। তিনি ভাঙনকবলিত এলাকা ঘুরে দেখেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তাদের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেন তিনি।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, ভাঙনপ্রবণ এলাকায় তাৎক্ষণিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কুড়িগ্রামে সাত দিনে বিলীন ৮০ ঘরবাড়ি

তিস্তার ভাঙনে একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে কুড়িগ্রামের উলিপুর ও রাজারহাট উপজেলায়। গত সাত দিনে এ দুই উপজেলায় ৮০টি ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

নিজেদের স্বপ্নের বসতবাড়ি চোখের সামনে নদীতে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা। গবাদিপশু ও সন্তানদের নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেবেন, সেই চিন্তায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা।

লালমনিরহাটের পাঁচ উপজেলাতেই ভাঙন

লালমনিরহাট জেলার পাঁচটি উপজেলাতেই তিস্তার ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। নদীর পানির উচ্চতা কমা-বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনের তীব্রতাও বাড়ছে।

বিজ্ঞাপন

লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল রায় বলেন, কয়েকটি স্থানে ভাঙন প্রতিরোধে জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। তবে স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধের জন্য বরাদ্দ না থাকায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

খুলিয়াগাছ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খায়রুজ্জামান বাদল বলেন, আগ্রাসী তিস্তা কোনোভাবেই থামছে না। প্রতিদিনই নদী ভাঙছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

রংপুরেও ভাঙনের শিকার ৫৩ পরিবার

রংপুরের পীরগাছা, কাউনিয়া ও গঙ্গাচড়া উপজেলাতেও তিস্তার ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। গত সাত দিনে এ তিন উপজেলায় ৫৩টি বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজ উদ্দিন।

তিস্তাপাড়ের মানুষের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে এলাকার পরিবেশ। ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারা বলছেন, তারা ত্রাণ চান না, চান স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ। তাদের মতে, স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা না হলে বারবার বসতভিটা হারানোর এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলবে না।

নীলফামারীতে খোলা আকাশের নিচে শত শত পরিবার

নীলফামারীর ভাঙনকবলিত এলাকাগুলোতে শত শত পরিবার নদীর তীরে খোলা জায়গায় দিন কাটাচ্ছে। অনেকের রান্না কিংবা খাবারের কোনো ব্যবস্থা নেই। কেউ উঁচু বাঁধে, আবার কেউ স্বজনদের বাড়ির আঙিনায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

ভুক্তভোগীদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে তাঁবু ও শুকনা খাবারের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

চর খরিবাড়ির বাসিন্দা আব্দুল করিম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘এখন কোথায় যায়া ঠাঁই নিমু! ঘর তোলার শেষ সম্বলটুকুও কাড়ি নিল রাক্ষসী তিস্তা। দুই বছরে ছয়বার নদী ভাঙার পর এই জায়গাত কোনোমতে মাথা গুঁজে আছনু। সেটাও চলি গেছে নদীত। হামারঘরে দুঃখ দেখার মতো কেউ নাই। চোখের সামনত ঘর দুইটা নদীত চলি গেল, কিছুই করবার পানু না।’

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের তাগিদ

তিস্তার ভাঙন পরিস্থিতি নিয়ে ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া কোনোভাবেই এই ভাঙন ঠেকানো সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, যত দ্রুত সম্ভব ২০২৭ সালের শুরুতেই নিজস্ব অর্থায়নে হলেও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করতে চায় সরকার। অন্যথায় এ অঞ্চলের মানুষের দুঃখ-কষ্ট কোনোভাবেই লাঘব করা সম্ভব হবে না।

তিস্তার অব্যাহত ভাঙনে একের পর এক পরিবার বসতভিটা হারাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তাৎক্ষণিক আশ্রয় ও খাদ্যসহায়তার পাশাপাশি স্থায়ী ভাঙন প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD