Logo

নানার ঘামে জিপিএ-৫, উচ্চশিক্ষার স্বপ্নে সহায়তা চায় শাহরিয়ার

profile picture
উপজেলা প্রতিনিধি
তাড়াশ, সিরাজগঞ্জ
১০ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৫৮
নানার ঘামে জিপিএ-৫, উচ্চশিক্ষার স্বপ্নে সহায়তা চায় শাহরিয়ার
ছবি: সংগৃহীত

এক হাতে বই-খাতা, অন্য হাতে কৃষিকাজের হাতিয়ার। দিনের বেলায় নানার সঙ্গে জমিতে কাজ, আর অবসরে পড়াশোনা—এভাবেই প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে এসএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে রাশিদ শাহরিয়ার।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু পরীক্ষায় এই সাফল্যের পরও তার আনন্দের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থসংকট। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণে এখন প্রয়োজন আর্থিক সহযোগিতা।

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ঘনিরামপুর বড়গোলা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া শাহরিয়ারের জীবন শুরু থেকেই নানা প্রতিকূলতায় ঘেরা। জন্মের মাত্র ১২ দিন পর মাকে হারায় সে। পরে বাবা অন্যত্র বিয়ে করে নতুন সংসার গড়েন। এমন পরিস্থিতিতে নাতির লালন-পালন ও পড়াশোনার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন ৭০ বছর বয়সী নানা আজিজার রহমান।

পেশায় কৃষক আজিজার রহমান নিজের সীমিত আয় দিয়ে নাতির পড়াশোনার খরচ চালিয়ে আসছেন। বয়সের ভারে শরীর দুর্বল হয়ে পড়লেও নাতির ভবিষ্যতের কথা ভেবে থেমে থাকেননি তিনি। অন্যদিকে নানার কষ্ট উপলব্ধি করে পড়াশোনার পাশাপাশি কৃষিকাজেও সহযোগিতা করছে শাহরিয়ার।

বিজ্ঞাপন

পৃথিবীতে আসার মাত্র ১২ দিনের মাথায় মাকে হারায় শাহরিয়ার। মায়ের স্নেহ-ভালোবাসা বোঝার আগেই তার জীবনে নেমে আসে বিচ্ছেদের কঠিন বাস্তবতা। পরবর্তী সময়ে বাবা অন্য সংসার গড়ে তোলায় নানার কাছেই বেড়ে ওঠে সে।

আজিজার রহমান শুধু নাতির অভিভাবক নন, তাঁর কাছে তিনিই সবচেয়ে আপনজন, আশ্রয় ও ভরসার জায়গা। নিজের বয়স ও শারীরিক সীমাবদ্ধতা উপেক্ষা করে নাতিকে পড়াশোনা করানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

আজিজার রহমানের বয়স এখন ৭০ বছর। কৃষিকাজ করে যে সামান্য আয় হয়, তা দিয়েই পাঁচ সদস্যের সংসার চালাতে হয় তাঁকে। খাবার, পোশাক, চিকিৎসা ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের পাশাপাশি নাতির শিক্ষার খরচ বহন করাও তাঁর জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।

কখনো নিজের জমিতে, কখনো অন্যের জমিতে কাজ করে নাতির বই-খাতা, পোশাক ও পরীক্ষার ফি জোগানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। নিজের প্রয়োজন উপেক্ষা করেও নাতির পড়াশোনাকে গুরুত্ব দিয়েছেন সবার আগে।

তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আগের মতো পরিশ্রম করা তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ছে। সংসারের ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি শাহরিয়ারের উচ্চশিক্ষার খরচ কীভাবে জোগাড় করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

নানার সীমিত আয়ের ওপর নির্ভর করে থাকতে চায় না শাহরিয়ার। তাঁর কষ্ট উপলব্ধি করে পড়াশোনার পাশাপাশি কৃষিকাজেও হাত লাগিয়েছে সে। কখনো জমিতে ফসলের পরিচর্যা, কখনো আগাছা পরিষ্কার, আবার কখনো নানার সঙ্গে অন্যান্য কৃষিকাজে সহযোগিতা করে।

কাজ শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাড়ি ফিরে আবার বই নিয়ে বসে সে। কৃষিকাজ ও পড়াশোনার মধ্যে সমন্বয় করে নিজের লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে এই তরুণ।

তার জীবনের প্রতিটি দিন যেন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে কাটে। একদিকে পরিবারের আর্থিক সংকট, অন্যদিকে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার আকাঙ্ক্ষা। এসব বাধা সত্ত্বেও পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রেখে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে সে।

বিজ্ঞাপন

শাহরিয়ারের এই ফলাফল শুধু তার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বৃদ্ধ নানার দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও ত্যাগ। প্রতিকূল পরিবেশেও পড়াশোনা চালিয়ে গিয়ে সে প্রমাণ করেছে, সীমিত সুযোগের মধ্যেও অধ্যবসায় সাফল্যের পথ তৈরি করতে পারে।

তবে মাধ্যমিকের এই সাফল্যের পর সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন নতুন করে প্রস্তুতি নেওয়া। উচ্চমাধ্যমিকের পড়াশোনা ও পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষার ব্যয় বহন করা তার পরিবারের পক্ষে কঠিন। ফলে ভালো ফলাফল অর্জনের আনন্দের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।

নাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আজিজার রহমান বলেন, “আমি যতদিন পারি ওর পড়াশোনার খরচ চালিয়ে যেতে চাই। কিন্তু বয়স হয়েছে, শরীর আর আগের মতো চলে না। সংসারের খরচ চালাতেই কষ্ট হয়। ওর পড়াশোনার খরচও আছে। সরকার বা সমাজের কেউ যদি ওর পড়াশোনার জন্য সহযোগিতা করে, তাহলে আমার অনেক কষ্ট কমবে।”

বিজ্ঞাপন

নাতিকে প্রতিষ্ঠিত মানুষ হিসেবে দেখতে চান তিনি। কিন্তু বয়সের কারণে কাজের সামর্থ্য কমে আসায় সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।

পড়াশোনা চালিয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায় শাহরিয়ার। তার স্বপ্ন নিজের জীবনে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি নানার দীর্ঘদিনের ত্যাগের প্রতিদান দেওয়া। যিনি নিজের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে তাকে আগলে রেখেছেন, তাঁর মুখে হাসি ফোটাতে চায় সে।

শাহরিয়ারের কাছে সাফল্য মানে শুধু ভালো ফলাফল কিংবা একটি চাকরি পাওয়া নয়; বরং নানার কষ্টের মূল্য দেওয়া এবং পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার মতো অবস্থানে পৌঁছানো।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয়দের ভাষ্য, আর্থিক সংকটের মধ্যেও শাহরিয়ার পড়াশোনা চালিয়ে গিয়ে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। এখন তার শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখতে আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন।

তাঁদের মতে, সরকারি শিক্ষাবৃত্তি, উপবৃত্তি এবং অসচ্ছল মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যমান সহায়তা কর্মসূচির আওতায় তাকে সহযোগিতা করা গেলে উচ্চশিক্ষার পথ সহজ হতে পারে। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, শিক্ষানুরাগী ও মানবিক মানুষের সহায়তাও তার ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দিন শেষে মাঠের কাজ সেরে বাড়ি ফিরে বই নিয়ে বসে শাহরিয়ার। তার চোখে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন, আর সেই স্বপ্নের পেছনে রয়েছে ৭০ বছর বয়সী নানার নিরলস শ্রম। অর্থের অভাবে যেন তার পড়াশোনা থেমে না যায়, সেটিই এখন পরিবারের প্রত্যাশা।

বিজ্ঞাপন

মায়ের স্নেহ পাওয়ার আগেই মাকে হারানো এই তরুণ জীবনের প্রতিটি ধাপে নানার হাত ধরে এগিয়েছে। এখন সেই নানার শরীর আর আগের মতো শক্তিশালী নয়। তাই শাহরিয়ারের স্বপ্ন পূরণে আর্থিক সহযোগিতা তার পরিবারের জন্য বড় সহায়তা হতে পারে।

এক হাতে বই আর অন্য হাতে কৃষিকাজের হাতিয়ার নিয়ে বেড়ে ওঠা শাহরিয়ার এখন উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যেতে চায়। তার মেধা ও পরিশ্রম যেন আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে বাধাগ্রস্ত না হয়, এটাই তার পরিবার ও স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD