সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ‘সিতি’ কি টাঙ্গাইলের সুইটি?

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বাংলাদেশি নারী ‘সিতি আখতার’ টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের সুইটি আক্তার কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। সরকারি নথিতে নামের মিল থাকলেও গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবির সঙ্গে মেয়ের চেহারার মিল নেই বলে দাবি করেছেন সুইটির পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের ভাষ্য, সুইটি এখনো সৌদি আরবের কারাগারে রয়েছেন এবং গত ১৩ অক্টোবরও পরিবারের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সুইটির বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার মহেড়া ইউনিয়নের নগর ছাওয়ালী গ্রামে। তিনি স্থানীয় বাসিন্দা ফজল মিয়ার মেয়ে। পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করতে কাজের সন্ধানে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) বহির্গমন ছাড়পত্র এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া নারীকে সুইটি আক্তার হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে পরিবারের সদস্যরা সরেজমিনে জানিয়েছেন, প্রকাশিত ছবির সঙ্গে তাঁদের মেয়ের চেহারার মিল নেই। সুইটির মা জহুরা বেগমের দাবি, সৌদি আরবে তাঁর মেয়েকে অনেকে ‘সিতি’ নামে চিনতেন।
পরিবারের সদস্যরা আরও জানান, সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে তাঁরা এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি চিঠি বা আনুষ্ঠানিক তথ্য পাননি। ফলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া নারী তাঁদের সুইটি কি না, তা নিয়ে তাঁরা নিশ্চিত হতে পারছেন না।
বিজ্ঞাপন
সরকারি নথিতে যা আছে
সরকারি নথি অনুযায়ী, সুইটি আক্তারের জন্ম ২০০১ সালের ১১ আগস্ট। ২০২৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ‘এস রানা ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল’-এর মাধ্যমে সৌদি আরবে যাওয়ার বহির্গমন ছাড়পত্র পান তিনি। সেখানে তাঁর নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ছিল ‘আল মাজাল আল আরাবি গ্রুপ কোম্পানি’।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
সম্প্রতি সৌদি আরবের মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজ’ করার দায়ে দুই বাংলাদেশিকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। এরপর থেকেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া নারীর পরিচয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
বিজ্ঞাপন
পরিবারের দাবি, এখনো কারাগারে সুইটি
সুইটির বাবা ফজল মিয়া বলেন, “গত মঙ্গলবারও আমার মেয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। এরপর থেকে আর কোনো যোগাযোগ নেই। তখন আমাকে বলেছিল, দুই মাস পরে বাড়িতে আসবে।”
তিনি দাবি করেন, প্রায় দুই বছর আগে সৌদি আরবে কর্মরত অন্য নারীদের সঙ্গে ঝগড়ার পর তাঁর মেয়েকে ফাঁসিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর প্রায় এক বছর মেয়ের কোনো খোঁজ পাননি তাঁরা।
বিজ্ঞাপন
ফজল মিয়া বলেন, “আমার মেয়ের সঙ্গে কারও সম্পর্ক নেই। তবে প্রকাশিত ছবির সঙ্গে আমার মেয়ের কোনো মিল নেই। যে কারণে আমরা কোনো কিছু করতে পারছি না। আমি সরকারের কাছে দাবি করছি, আমার মেয়েকে ফেরত চাই।”
তিনি আরও জানান, তাঁর মেয়েকে বলা হয়েছিল, একজন আইনজীবী তাঁকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেবেন। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের কেউ তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি বলে দাবি করেন তিনি।
ফজল মিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে কাজের জন্য সৌদি আরবে যান সুইটি। সেখানে হজে যাওয়া ব্যক্তিদের দেখাশোনার কাজ করতেন তিনি। সুইটির বিয়ে হয়েছিল, পরে বিচ্ছেদ হয়।
বিজ্ঞাপন
সুইটির মা জহুরা বেগমও মেয়ের ছবি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “প্রকাশিত ছবির সঙ্গে আমার মেয়ের মিল নেই। নামের মিল রয়েছে। তাই আমরা কান্নাকাটি করি। আমার সুইটিরে মেরে ফেলাইছে। আমার মেয়ে কোন অপরাধ করেছে যে, তাকে মারব? আমার মেয়ে কোনো অপরাধ করেনি।”

জহুরা বেগম জানান, সংসার না টেকায় সুইটি দ্বিতীয়বার বিয়ে করেননি। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে বিদেশে কাজ করতে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে যাওয়ার পর প্রায় ছয় মাস কাজ করেছিলেন বলে তাঁর দাবি। পরে অন্য নারীদের সঙ্গে ঝগড়ার ঘটনায় পুলিশ তাঁকে আটক করে। এরপর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন বলে পরিবারকে জানানো হয়েছিল।
সুইটির চার বছর বয়সী একটি মেয়েও রয়েছে। সৌদি আরবে যাওয়ার পর শিশুটিকে লালন-পালনের জন্য নিজের কাছে নিয়ে যান সুইটির বড় বোন বিউটি।
বিজ্ঞাপন
প্রশাসনের কাছেও নেই নিশ্চিত তথ্য
মহেড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিভাস সরকার নুপুর বলেন, গণমাধ্যমে খবরটি জানার পর বিষয়টি তাঁর নজরে এসেছে। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া নারীই মহেড়া গ্রামের সুইটি আক্তার কি না, তা তিনি নিশ্চিত নন। যদিও সুইটির ভগ্নিপতি আব্দুল মালেক তাঁকে জানিয়েছেন, সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ‘সিতি আখতার’ তাঁদের পরিবারের সুইটি।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
মির্জাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, এ বিষয়ে তাঁর কাছে কোনো তথ্য নেই।
বিজ্ঞাপন
মির্জাপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জহিরুল আলম বলেন, “বিষয়টি আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি। যদি সুইটির বাড়ি মির্জাপুরে হয়ে থাকে, তাহলে মরদেহ নেওয়ার ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আমাদের চিঠি দেবে। বিষয়টি নিয়ে আমরাও নিশ্চিত নই।”
টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ শামছুল আলম সরকার জানান, এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে তথ্য নিয়ে পরে জানাতে হবে।
সব মিলিয়ে, নামের মিল ও পরিবারের এক সদস্যের বক্তব্যের বাইরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া নারী এবং টাঙ্গাইলের সুইটি আক্তার একই ব্যক্তি কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পরিচয় নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তথ্য ও যাচাই প্রয়োজন।








