Logo

নেপালে বন্যার তাণ্ডব, নিখোঁজ স্বজনদের ফেরার অপেক্ষায় নেপাল

profile picture
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৪:৪০
নেপালে বন্যার তাণ্ডব, নিখোঁজ স্বজনদের ফেরার অপেক্ষায় নেপাল
ছবি: সংগৃহীত

হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধসে সৃষ্ট আকস্মিক ভয়াবহ বন্যায় নেপাল ও তিব্বত সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় নেমে এসেছে চরম মানবিক বিপর্যয়। ভয়াবহ এই দুর্যোগে নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে ১২০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন হাজারো মানুষ।

বিজ্ঞাপন

সরকারি ও বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী, নেপালেই ৫ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। চীনের তিব্বত অঞ্চলে নিখোঁজের সংখ্যা ৫৪৬। দুর্গম এলাকা ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উদ্ধারকারী দল এখনো অনেক স্থানে পৌঁছাতে পারেনি।

ঘটনার দিন সকালে হিমালয়ের উঁচু সীমান্ত এলাকায় একটি বিশাল হিমবাহ ধসে যায়। এরপর কালো পানির প্রবল স্রোত নেপালের ভোটেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর উপত্যকা দিয়ে দ্রুত নিচের দিকে নেমে আসে। সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে শুরু হওয়া এই বিপর্যয়ের মাত্র ১৩ মিনিটের মধ্যে, অর্থাৎ ৮টা ৫০ মিনিটের মধ্যেই বেত্রাবতী বাজার ও আশপাশের বসতি ভয়াবহ কাদা ও পানিতে তলিয়ে যায়।

প্রাণ বাঁচাতে মানুষ পাহাড় ও জঙ্গলের দিকে ছুটে যান। ত্রিশূলী নদীর ওপর থাকা একাধিক সেতু পানির প্রবল স্রোতে ভেঙে যায়। নদীও তার স্বাভাবিক গতিপথ হারিয়ে মহাসড়কের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বেত্রাবতীতে কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্তূপ এতটাই পুরু হয়েছে যে ছয়তলা একটি ভবনের শুধু ওপরের দুই তলা দেখা যাচ্ছে। পুরো এলাকা পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। কোথাও পড়ে আছে উল্টে যাওয়া স্কুলবাস, কোথাও প্রায় ২০০ মিটার দূরে ভেসে যাওয়া দোকান। কাদার মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে মানুষের চশমা, ওষুধ, থালাবাসন ও বইপত্র। শুধু বেত্রাবতী এলাকাতেই অন্তত ২৫০ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

বেত্রাবতীর ৭০ বছর বয়সী বাসিন্দা দিল বাহাদুর শ্রেষ্ঠা এখনো কাদার স্তূপে খুঁজে বেড়াচ্ছেন ৫০ বছরের জীবনসঙ্গিনী যমুনা শ্রেষ্ঠাকে। দুর্যোগের সময় যমুনা তাদের হাঁস-মুরগি ও ছাগল নিরাপদে সরানোর চেষ্টা করছিলেন। তখনই প্রবল কালো পানির ঢেউ এসে মুহূর্তের মধ্যে তাদের ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নেয়।

বিজ্ঞাপন

দিল বাহাদুর জানান, চোখের সামনে দুটি সেতু ভেঙে যেতে দেখেছেন তিনি। প্রবল স্রোতের আঘাতের পর মাত্র দুই মিনিটের মধ্যে সবকিছু ধ্বংস হয়ে যায়। এরপর থেকে খালি হাতে মাটি ও কাদা সরিয়ে স্ত্রীকে খুঁজে চলেছেন তিনি।

২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর নতুন করে ঘর তৈরি করেছিলেন এই দম্পতি। স্ত্রীকে হারানোর আশঙ্কায় ভেঙে পড়া দিল বাহাদুরের এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না যমুনা নেই। তার মনে হচ্ছে, হয়তো কোথাও বেঁচে আছেন এবং হাঁস-মুরগি ও ছাগলগুলোর দেখাশোনা করছেন। স্বজন ও প্রতিবেশীদের হারিয়ে নিজেকে সম্পূর্ণ একা মনে করছেন তিনি।

একই এলাকার ৫৭ বছর বয়সী সান্তামায়া লাওয়াতও হারিয়েছেন জীবনের বড় স্বপ্ন। মাত্র ১০ মাস আগে সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে নির্মাণ করা তার নতুন বাড়িটি এখন পুরোপুরি কাদার নিচে চাপা। নিজের পাঁচ স্বজনকে হারানোর পর ভাইয়ের আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি থেকে কিছু কাপড় ও কম্বল উদ্ধার করছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

সান্তামায়ার ভাষায়, যে বাড়িতে সারাজীবন থাকার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেটি এখন কেবল কাদার স্তূপ। একসময় সুন্দর যে এলাকা ছিল, সেটিই আজ ভয়াবহ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

বেত্রাবতীর উত্তরে তিব্বত সীমান্তবর্তী রসুয়া জেলার পরিস্থিতিও ভয়াবহ। বহু গ্রাম কার্যত মানচিত্র থেকে মুছে গেছে। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় অনেক এলাকায় এখন সেনাবাহিনী ও উদ্ধারকারী দলের হেলিকপ্টারই যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম।

সীমান্তবর্তী তিমুরে গ্রামে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে ইতোমধ্যে ৯০টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। অন্যদিকে রসুয়া জেলার প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্যাব রু বেসি এলাকার একটি গ্রাম নদীর কাদা ও পাথরের নিচে প্রায় সম্পূর্ণ চাপা পড়েছে। গ্রামটির প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ, অর্থাৎ আনুমানিক ৫০০ জন নিখোঁজ রয়েছেন। সেখানে মাত্র একটি ভবন অক্ষত রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এই গ্রাম থেকে বেঁচে ফেরা ৫০ বছর বয়সী কৃষক ছিরিং দর্জি জানান, ১৫ থেকে ১৬ জন কোনোভাবে জঙ্গল ও পাহাড়ের চূড়ায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। খাবার না থাকায় বনের পানি পান করে তারা দুই দিন কাটান। পরে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার তাদের উদ্ধার করে ধুনচে সেনাশিবিরে নিয়ে যায়।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

ছিরিং দর্জি এখন তার ৯ বছর বয়সী নাতনি রিতু তামাংকে নিয়ে কাঠমান্ডু যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। তাদের পরিবারের পাঁচ সদস্য এখনো নিখোঁজ। রিতু জানায়, তাদের বাড়ির কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। সে যে স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে পড়ত, সেই স্কুলটিও ধ্বংস হয়েছে; তার শিক্ষক ও সহপাঠীদেরও কোনো সন্ধান নেই।

বিজ্ঞাপন

দুর্যোগে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাঠমান্ডু থেকে রসুয়া যাওয়ার যে পথটি এখনো ব্যবহার করা যাচ্ছে, সেটিও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কাদা ও পাথরে ভরা ওই সড়ক পাড়ি দিতে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় লাগছে। ফলে ধুনচে এলাকায় বহু ত্রাণবাহী ট্রাক আটকা পড়ে আছে এবং সেগুলো উত্তর দিকে যেতে পারছে না।

বেত্রাবতী ও ধুনচের মাঝামাঝি এলাকায় ধুলিখেল হাসপাতালের উদ্যোগে একটি ত্রাণশিবির ও চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে এমন অনেক শিশু এসেছে, যারা বন্যায় বাবা-মাকে হারিয়েছে।

স্থানীয় নীলকণ্ঠ স্কুলের শিক্ষক প্রকাশ নেপাল জানান, ঘটনার সময় স্কুলে যাওয়ার পথে অন্তত ২০০ শিক্ষার্থী নিখোঁজ হয়েছে। তাদের অধিকাংশের বয়স ৫ থেকে ১১ বছরের মধ্যে। তবে একটি স্কুলবাসকে বন্যার মাত্র ১০ মিনিট আগে সতর্ক করে থামিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। এতে বাসে থাকা শিশুরা প্রাণে বেঁচে যায়।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু হেঁটে স্কুলে আসা অনেক শিশুকে আর রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয় অনেক পরিবার ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের পর নদীর তীরে অস্থায়ী বসতিতে বসবাস করছিলেন বলেও জানা গেছে।

এত ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যেও কিছু মানুষের বেঁচে ফেরার ঘটনা স্বজনদের মধ্যে আশার আলো জ্বালিয়েছে। ল্যাচিয়াং গ্রামের ৬৯ বছর বয়সী রামকৃষ্ণ নেউমানে ও তার ৬৬ বছর বয়সী স্ত্রী মুইয়া নেউমানে দুই দিন পর তাদের একমাত্র ছেলের বেঁচে থাকার খবর পান।

তাদের ছেলে স্যাব রু বেসি এলাকায় পশুচিকিৎসক হিসেবে কাজ করতেন। বন্যার পর দুই দিন তার কোনো খোঁজ না পেয়ে মা-বাবা ধরে নিয়েছিলেন তিনি আর বেঁচে নেই। কিন্তু দুই দিন পর কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতাল থেকে ফোন করে ছেলে জানান, সেনাসদস্যরা তাকে জীবিত উদ্ধার করেছেন। এই খবর পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার বাবা-মা।

বিজ্ঞাপন

ভয়াবহ এই দুর্যোগে নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকায় এখনো চলছে উদ্ধার অভিযান। কোথাও স্বজন হারানোর কান্না, কোথাও নিখোঁজদের ফিরে আসার অপেক্ষা—প্রকৃতির ভয়াবহ তাণ্ডনের পর দেশজুড়ে বিরাজ করছে শোক ও অনিশ্চয়তা।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD