Logo

‘আগামী এক বছরের মধ্যে মোদী সরকারের পতন হবে’

profile picture
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
৫ নভেম্বর, ২০২৬, ১৫:৪৫
‘আগামী এক বছরের মধ্যে মোদী সরকারের পতন হবে’
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আগামী এক বছরের মধ্যে মোদী সরকারের পতন ঘটতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। তার দাবি, সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতরেই দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। একসময় যে ব্যবস্থাগুলো সরকারের নির্দেশে পরিচালিত হতো, সেগুলো এখন ভেতর থেকেই নড়বড়ে হয়ে পড়ছে।

বিজ্ঞাপন

রাহুলের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ভারতে বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি, দুর্নীতির অভিযোগ, নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আন্দোলন রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। বিরোধী দলগুলোও এসব ইস্যুতে মোদী সরকারের ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

তবে রাহুল গান্ধীর এই ভবিষ্যদ্বাণী কতটা বাস্তবসম্মত? সত্যিই কি আগামী এক বছরের মধ্যে ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে মোদী সরকার? ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কী ইঙ্গিত দিচ্ছে?

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আন্দোলন মোদী সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও তরুণদের ক্ষোভ রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২০২৬ সালের জুন-জুলাইয়ে নিট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস ও শিক্ষা ব্যবস্থায় অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের বিক্ষোভ শুরু হয়। দিল্লিসহ বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও তরুণ রাস্তায় নামেন। একপর্যায়ে আন্দোলনের উত্তাপ পার্লামেন্টেও ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে বিরোধী দলগুলোর প্রতিবাদে সংসদীয় কার্যক্রমেও অচলাবস্থা তৈরি হয়।

জুলাইয়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর আন্দোলনকারী তরুণদের সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। তবে আন্দোলনের মূল দাবি শুধু পরীক্ষার অনিয়মে সীমাবদ্ধ ছিল না। বেকারত্ব, কর্মসংস্থানের সংকট ও সরকারের জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে আসে।

এরপর অক্টোবরে আবারও বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ে মোদী সরকার। এবার বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

১ নভেম্বর নয়াদিল্লির রামলীলা ময়দানে আয়োজিত সমাবেশে হাজার হাজার মানুষ অংশ নেন। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে ইন্ডিয়া জোটের নেতারা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেন।

বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের বড় একটি অংশ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। এর ফলে তাদের ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

অবশ্য নির্বাচন কমিশন ও সরকারের অবস্থান ভিন্ন। তাদের দাবি, তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের মধ্যে ভুয়া, দ্বৈত ও অযোগ্য ভোটার রয়েছেন। ভুলবশত কারও নাম বাদ পড়লে পুনরায় নিবন্ধনের সুযোগও রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ভারতের রাজনৈতিক অস্থিরতার অন্যতম কারণ হিসেবে সামনে আসছে বেকারত্ব। অর্থনীতির আকার বড় হলেও বিপুলসংখ্যক তরুণের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এখনো দেশটির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করছেন। কিন্তু তাদের অনেকেই যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছেন না। সরকারি নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা, পরীক্ষায় অনিয়ম এবং নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়াচ্ছে।

ভারতের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাধ্যমিক বা তার বেশি শিক্ষিত ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সীদের বেকারত্বের হার ছিল ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। আগের বছর এই হার ছিল ৭ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ পরিসংখ্যানে কিছুটা উন্নতি দেখা গেলেও শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের সংকট এখনো বড় উদ্বেগের বিষয়।

নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনও এই অসন্তোষের প্রতিফলন। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, দীর্ঘ প্রস্তুতির পরও পরীক্ষায় অনিয়মের কারণে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।

ভারত বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি। দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধিও তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। তবে এই প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, খাদ্য ও জ্বালানির ব্যয়, জীবনযাত্রার বাড়তি খরচ এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা সাধারণ মানুষের ওপর চাপ তৈরি করছে।

অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) ২০২৬ সালের জুনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) জুলাই ২০২৬-এর পূর্বাভাসে চলতি বছরে ভারতের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এসব পরিসংখ্যান থেকে ভারতের অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।

রাহুল গান্ধীর অভিযোগ, অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হলে জনঅসন্তোষ নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর অবস্থান নিতে পারে। এমনকি জরুরি অবস্থার মতো পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন তিনি।

মোদী সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের অন্যতম প্রধান অভিযোগ হলো দুর্নীতি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন।

সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, তদন্তকারী সংস্থার ভূমিকা, নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম এবং বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে তদন্ত নিয়ে নিয়মিত সমালোচনা করছে কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো।

বিশেষ করে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কে এই অভিযোগ নতুন মাত্রা পেয়েছে। রাহুল গান্ধীর দাবি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে। তার অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকেও সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে তথ্য বিরোধীদের কাছে আসছে। এই পরিস্থিতিকে তিনি ‘প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্রোহ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তবে বিরোধীদের এসব অভিযোগের সবগুলো স্বাধীনভাবে প্রমাণিত নয়। বিজেপি ও সরকার বরাবরই অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছে।

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্সের (এনডিএ) শরিকদের সমর্থনে সরকার গঠন করে। এর ফলে সরকার পরিচালনায় জোটের সহযোগী দলগুলোর গুরুত্ব বেড়েছে।

বিরোধীদের কাছে এটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। কংগ্রেসের পাশাপাশি তৃণমূল কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি ও বাম দলসহ ইন্ডিয়া জোটের শরিকরা বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে।

১ নভেম্বর দিল্লির সমাবেশে মমতা ব্যানার্জীর তৃণমূল কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি এবং বামপন্থি নেতাদের অংশগ্রহণ বিরোধীদের সম্মিলিত অবস্থানের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।

রাহুল গান্ধী এখন শুধু সরকারের নীতির সমালোচনা করছেন না, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও নির্বাচনি ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়েও সরাসরি প্রশ্ন তুলছেন।

এতে মোদী সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। তবে বিরোধী দলগুলোর অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য, নেতৃত্বের প্রশ্ন এবং নির্বাচনি কৌশলে সমন্বয়ের অভাব তাদের জন্য বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে।

রাহুল গান্ধীর বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও আগামী এক বছরের মধ্যে মোদী সরকারের পতন নিশ্চিত—এমন কোনো পরিস্থিতি এখনো স্পষ্ট নয়।

ভারতের সংবিধান অনুযায়ী, লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন ধরে রাখতে পারলে সরকার তার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারে। ২০২৪ সালে গঠিত বর্তমান লোকসভার স্বাভাবিক মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত।

আরও পড়ুন

তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেও সরকার পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। জোটের শরিকেরা সমর্থন প্রত্যাহার করলে, সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে কিংবা অনাস্থা ভোটে পরাজিত হলে আগাম ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটতে পারে।

বর্তমানে মোদী সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনঅসন্তোষ মোকাবিলা, কর্মসংস্থান বাড়ানো, অর্থনৈতিক চাপ সামাল দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থা বজায় রাখা।

অন্যদিকে বিরোধীদেরও জনঅসন্তোষকে রাজনৈতিক সমর্থনে রূপান্তর করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ অবস্থান, কার্যকর নির্বাচনি কৌশল এবং জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য বিকল্প কর্মসূচি।

সব মিলিয়ে মোদী সরকার রাজনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে। আন্দোলন, অর্থনৈতিক উদ্বেগ ও বিরোধীদের সম্মিলিত তৎপরতা সেই চাপ আরও দৃশ্যমান করেছে। তবে আগামী এক বছরের মধ্যে ক্ষমতা হারানোর পরিস্থিতি তৈরি হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। রাহুল গান্ধীর ভবিষ্যদ্বাণী শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ নেয় কি না, সেটিই এখন ভারতের রাজনীতির অন্যতম আলোচিত প্রশ্ন।

সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস, আউটলুক ইন্ডিয়া, রয়টার্স ও ওইসিডি

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD