Logo

প্যাকেটের পুষ্টির দাবি কতটা ভরসার, জানেন কি অভিভাবকরা?

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৬:১৭
প্যাকেটের পুষ্টির দাবি কতটা ভরসার, জানেন কি অভিভাবকরা?
ছবি: সংগৃহীত

ঢাকার মিরপুরের আট বছরের সাইফ স্কুল থেকে ফিরেই প্রায়ই মায়ের কাছে কেক বা বিস্কুট চায়। সপ্তাহে কয়েক দিন তার টিফিনে থাকে প্যাকেটজাত খাবার। বিকেলে খেলতে যাওয়ার সময় কখনো কিনে নেয় কোমল পানীয়ও। সাইফের মা নাজমা আক্তারের ধারণা, প্যাকেটের গায়ে যেহেতু পুষ্টি, ভিটামিন বা নানা উপকারী উপাদানের কথা লেখা থাকে, তাই খাবারটি খুব ক্ষতিকর হওয়ার কথা নয়।

বিজ্ঞাপন

তবে কিছুদিন আগে একটি পণ্যের প্যাকেট হাতে নিয়ে তার সেই ধারণায় প্রশ্ন তৈরি হয়। সামনে বড় অক্ষরে পুষ্টির নানা দাবি থাকলেও পেছনে উপাদান ও পুষ্টিমান লেখা ছিল তুলনামূলক ছোট অক্ষরে। কোন তথ্য সন্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তা বুঝতে পারেননি তিনি।

নাজমা আক্তারের প্রশ্ন, “প্যাকেটের গায়ে এত কথা লেখা থাকে। কিন্তু কোন তথ্য দেখে আমি বুঝব খাবারটি আমার সন্তানের জন্য কতটা ভালো?”

এই প্রশ্ন শুধু একটি পরিবারের খাদ্যাভ্যাসের নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে খাদ্যপণ্যের নিরাপত্তা, তথ্যের স্বচ্ছতা, দায়িত্বশীল বিপণন, পরিবেশগত প্রভাব এবং প্রতিষ্ঠানের সামাজিক দায়বদ্ধতা। শিশুদের জন্য পণ্য তৈরি ও বাজারজাত করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল ব্যবসায় শিশুর অধিকার ও কল্যাণ কতটা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়।

বিজ্ঞাপন

প্যাকেটের সামনে একরকম, পেছনে আরেক তথ্য

বাংলাদেশে শিশুদের খাদ্যতালিকায় বিস্কুট, কেক, চিপস, চকলেট, বিভিন্ন পানীয়সহ নানা ধরনের প্যাকেটজাত খাবারের উপস্থিতি বেড়েছে। এসব পণ্যের মোড়কে সাধারণত উজ্জ্বল রং, আকর্ষণীয় ছবি, শিশুদের উপযোগী ভাষা এবং পুষ্টি বা বিশেষ উপকারের দাবি থাকে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

অভিভাবকেরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে অনেক সময় প্যাকেটের সামনের অংশটিই বেশি গুরুত্ব দেন। অথচ উপাদান তালিকা, পুষ্টিমান, পরিবেশন মাত্রা ও সতর্কতামূলক তথ্য সাধারণত থাকে পেছনে।

বিজ্ঞাপন

ঢাকার উত্তরার দুই সন্তানের মা মারুফা আক্তার বলেন, “সন্তানের জন্য খাবার কেনার সময় প্যাকেটের পেছনের পুষ্টি ও উপাদানের তালিকা সাধারণত দেখা হয় না। সময়ের অভাবেও বিস্তারিত পড়া হয় না। সামনে সুন্দরভাবে পুষ্টির কথা লেখা থাকলে সেটাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।”

তার ভাষ্য, কোনো খাবারে কত চিনি, লবণ বা চর্বি রয়েছে, তা অনেক সময় জানা হয় না।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট এবং কয়েকটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের একটি গবেষণায় বাংলাদেশের বাজারে থাকা ২৪টি প্যাকেটজাত প্রক্রিয়াজাত খাবারের পুষ্টিমান পরীক্ষা করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, ৪৬ শতাংশ পণ্যের মোড়কে সম্পৃক্ত চর্বির তথ্য ছিল না। মোট খাদ্যতন্তু ও রূপান্তরিত চর্বির তথ্য অনুপস্থিত ছিল ৩৮ শতাংশ পণ্যে। এছাড়া ২১ শতাংশ পণ্যে চিনির তথ্য এবং একই সংখ্যক পণ্যে লবণের তথ্য দেওয়া হয়নি।

বিজ্ঞাপন

গবেষকেরা পরীক্ষাগারে পাওয়া পুষ্টিমান ও প্যাকেটে ঘোষিত তথ্যের তুলনাতেও পার্থক্য পেয়েছেন। একটি চিপসের নমুনায় পরীক্ষায় পাওয়া সম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ মোড়কে ঘোষিত পরিমাণের তুলনায় ৭৮০ দশমিক ২ শতাংশ বেশি ছিল। একটি চানাচুরের নমুনায় পরীক্ষায় পাওয়া চিনির পরিমাণ ঘোষিত মাত্রার চেয়ে ১ হাজার ৬৪৪ শতাংশ বেশি পাওয়া যায়।

গবেষকদের মতে, প্যাকেটজাত খাবারের পুষ্টি সম্পর্কে ভোক্তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বিদ্যমান তথ্য সব ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়।

‘পুষ্টিকর’ লেখা থাকলেই কি খাবার স্বাস্থ্যকর?

বিজ্ঞাপন

শিশুদের খাবারের মোড়কে ‘পুষ্টিকর’, ‘স্বাস্থ্যকর’ বা কোনো নির্দিষ্ট ভিটামিন-উপাদানের উপস্থিতির দাবি অভিভাবকের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু কোনো একটি পুষ্টি উপাদান থাকলেই পুরো খাবারটি স্বাস্থ্যকর—এমন ধারণা সঠিক নয়।

ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টারের পুষ্টিবিদ ও খাদ্য পরামর্শক সাবিহা সুলতানা বলেন, শিশুদের জন্য প্যাকেটজাত খাবার কেনার সময় শুধু প্যাকেটের সামনের লেখা বা বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। উপাদান তালিকা, চিনি, লবণ, সম্পৃক্ত ও রূপান্তরিত চর্বির পরিমাণ এবং মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ দেখা জরুরি।

তার মতে, উপাদান তালিকার শুরুতেই চিনি বা বিভিন্ন ধরনের মিষ্টিকারক উপাদান থাকলে খাবারটিতে চিনির পরিমাণ বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। একইভাবে অতিরিক্ত লবণ ও চর্বির উপস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হবে। কোনো শিশুর নির্দিষ্ট খাবারে অ্যালার্জি থাকলে প্যাকেটের সতর্কতামূলক তথ্যও দেখা প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

শিশুদের খাদ্যঝুঁকি একমুখী নয়

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের সর্বশেষ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) অনুযায়ী, দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ২৪ শতাংশ খর্বকায় এবং ১৩ শতাংশ ক্ষীণকায়। একই সঙ্গে শিশুদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজনের সমস্যাও রয়েছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২০২৫ সালে বাংলাদেশে পরিচালিত একাধিক জরিপের প্রাথমিক ফলাফলে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ১ দশমিক ৭ শতাংশের অতিরিক্ত ওজনের তথ্য পাওয়া যায়।

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ শিশুদের পুষ্টি নিয়ে আলোচনায় শুধু অপুষ্টি নয়, অতিরিক্ত চিনি, লবণ, চর্বি এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের সম্ভাব্য প্রভাবও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপনও বদলে দেয় শিশুর পছন্দ

শিশুদের খাদ্যবাজারে বিজ্ঞাপনের প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম, খেলাধুলার অনুষ্ঠান ও ডিজিটাল মাধ্যমে নানা ধরনের খাবারের প্রচার শিশুদের সামনে পৌঁছে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শিশুদের লক্ষ্য করে খাবারের প্রচারে কার্টুন চরিত্র, খেলোয়াড়, উপহার, প্রতিযোগিতা, খেলা, প্যাকেটের নকশা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও জনপ্রিয় ব্যক্তিদের ব্যবহার করা হয়। এসব কৌশল শিশুদের খাবারের পছন্দ এবং বাবা-মায়ের কাছে নির্দিষ্ট পণ্য কেনার অনুরোধকে প্রভাবিত করতে পারে।

ঢাকার নালন্দা উচ্চ বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী আফ্রিদা জান্নাত বলে, “বিজ্ঞাপনে যখন দেখি অন্য বাচ্চারা খাচ্ছে, তখন আমারও খেতে ইচ্ছে করে। বাবা-মাকে মাঝেমধ্যেই ওই খাবারগুলো কিনে দিতে বলি।”

শিশু নিজে সরাসরি ক্রেতা না হলেও পরিবারের ক্রয় সিদ্ধান্তে তার প্রভাব তৈরি হতে পারে।

স্কুলের আশপাশেও সহজলভ্য প্যাকেটজাত খাবার

শিশুদের খাদ্যাভ্যাসে স্কুলের আশপাশের পরিবেশও ভূমিকা রাখে। রাজধানীর কয়েকটি স্কুলের সামনে ছুটির সময়ে ছোট দোকান, ভ্যান ও অস্থায়ী খাবারের দোকানে শিশুদের ভিড় দেখা যায়। সেখানে বিস্কুট, চিপস, কেক, চকলেট, মিষ্টিজাতীয় খাবার ও বিভিন্ন ধরনের পানীয় বিক্রি হয়।

রাজধানীর কাকলি উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে দোকান নিয়ে বসা মনসুর আলম বলেন, স্কুল ছুটির সময় শিশুদের কাছে ছোট প্যাকেটের কেক, বিস্কুট, চিপস ও বিভিন্ন পানীয়ের চাহিদা বেশি থাকে। প্যাকেটে আকর্ষণীয় ছবি বা লেখা থাকলে শিশুরা সেগুলোর প্রতি বেশি আগ্রহ দেখায়। কম দাম হওয়ায় অনেক শিশু নিজের কাছে থাকা টাকা দিয়েই এসব খাবার কিনে নেয়।

মিরপুরের মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে সন্তানের জন্য খাবার কিনছিলেন আসমাউল হোসনা। তিনি বলেন, স্কুল থেকে ফেরার সময় প্রায় প্রতিদিনই সন্তান খাবার কিনতে চায়। প্রতিদিন কী খাচ্ছে, তা সব সময় খেয়াল রাখা সম্ভব হয় না। প্যাকেটের ছবি দেখা হলেও ভেতরের তথ্য সব সময় পড়া হয় না।

মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা মনের বন্ধু’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তৌহিদা শিরোপার মতে, শিশুদের খাবারের পছন্দ শুধু স্বাদ বা প্রয়োজনের ওপর নির্ভর করে না। প্যাকেটের রং, ছবি, কার্টুন চরিত্র, বিজ্ঞাপনের ভাষা এবং অন্য শিশুদের উপস্থাপনও তাদের পছন্দে প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রতিষ্ঠানের দায় শুধু সিএসআরে সীমাবদ্ধ নয়

শিশুদের জন্য খাবার উৎপাদন ও বাজারজাত করা একটি ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড। তবে সেই ব্যবসার সঙ্গে ভোক্তার নিরাপত্তা, পণ্যের মান, তথ্যের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নও জড়িত।

শিশুদের জন্য খাবার বাজারে আনার আগে পণ্যের কী ধরনের পরীক্ষা করা হয়, পুষ্টিমান কীভাবে যাচাই করা হয় এবং মোড়কে দেওয়া তথ্য কীভাবে নিশ্চিত করা হয়—এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে কোনো ভোক্তার অভিযোগ এলে সেটি নথিভুক্ত ও যাচাই করার ব্যবস্থা আছে কি না, ঝুঁকিপূর্ণ বা সমস্যাযুক্ত পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া কী, সেটিও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলতার অংশ।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল বলেন, “বাংলাদেশের খাদ্যপণ্যের প্যাকেজিং সংক্রান্ত গাইডলাইন ও প্রযোজ্য মানদণ্ড অনুসরণ করে প্রাণ-এর সকল খাদ্যপণ্যের মোড়ক তৈরি করা হয়।”

তিনি জানান, প্যাকেজিংয়ে পণ্যের আকার, পুষ্টিমান, উপাদান এবং ভোক্তাদের প্রয়োজনীয় অন্যান্য তথ্য উপস্থাপনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়।

আরও পড়ুন

পরিবেশের বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, যেসব মোড়ক পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব, সেগুলো রিসাইকেল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। যেগুলো রিসাইকেল করা সম্ভব নয়, সেগুলো দায়িত্বশীলভাবে ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব কমানোর চেষ্টা করা হয়।

শিশুর অধিকার ব্যবসার বাইরের বিষয় নয়

বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান শিশুদের জন্য বৃত্তি, স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টি কর্মসূচিসহ নানা সামাজিক উদ্যোগ পরিচালনা করে। এগুলো করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ। তবে শিশুদের অধিকার ও কল্যাণের বিষয়টি প্রতিষ্ঠানের মূল ব্যবসার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা আব্দুল্লাহ হাসান বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শুধু বৃত্তি দেওয়া বা স্বাস্থ্য কর্মসূচি পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিষ্ঠান যে পণ্য তৈরি ও বাজারজাত করছে, সেগুলো শিশুদের স্বাস্থ্য ও কল্যাণের জন্য কতটা নিরাপদ, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

তার মতে, শিশুদের লক্ষ্য করে পণ্য বাজারজাত করার ক্ষেত্রে তথ্যের স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীল প্রচার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিশুরা অনেক ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন ও পণ্যের তথ্য সম্পর্কে প্রাপ্তবয়স্কদের মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।

অর্থাৎ কোনো প্রতিষ্ঠান সামাজিক কাজে কত টাকা ব্যয় করেছে, শুধু সেটি দিয়ে শিশুবান্ধব ব্যবসায়িক দায়বদ্ধতা বিচার করা যায় না। প্রতিষ্ঠানটির মূল ব্যবসা কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

মোড়কের তথ্য হতে হবে সহজ ও স্পষ্ট

একজন অভিভাবক যেন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বুঝতে পারেন একটি খাবারে কত চিনি, লবণ বা চর্বি রয়েছে, পরিবেশন মাত্রা কত এবং কোনো সতর্কতা আছে কি না—এমন তথ্য উপস্থাপন পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ শিশু একাডেমির কর্মকর্তা রেজিনা আক্তার বলেন, দেশে একদিকে শিশুদের অপুষ্টির সমস্যা রয়েছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত ওজন ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের ঝুঁকিও বাড়ছে। তাই শিশুদের খাবারের ক্ষেত্রে শুধু উৎপাদন ও বিক্রির বিষয়টি দেখলে হবে না; স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও কল্যাণকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

তার মতে, প্যাকেটের তথ্য সহজ ও স্পষ্ট হওয়া দরকার, যাতে অভিভাবকেরা দ্রুত বুঝতে পারেন তারা সন্তানের জন্য কী কিনছেন। শিশুদের লক্ষ্য করে বিজ্ঞাপনের ভাষা ও উপস্থাপনাও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন।

তবে প্যাকেটের পেছনে আইনগতভাবে তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও সেগুলো অনেক সময় ছোট অক্ষরে লেখা হয়। ফলে সাধারণ ক্রেতার জন্য তথ্য পড়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে চিনি, লবণ বা ক্ষতিকর ফ্যাটের পরিমাণ সহজে চোখে না পড়লে সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও সীমিত হয়।

সমাধান কোথায়?

শিশুদের জন্য প্যাকেটজাত খাবারের বাজার বন্ধ করার প্রশ্ন নয়; বরং বাজারকে আরও নিরাপদ, স্বচ্ছ ও তথ্যসমৃদ্ধ করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

পুষ্টিবিদ সাবিহা সুলতানা বলেন, প্যাকেটের পুষ্টিমান দেখার সময় পরিবেশন মাত্রা বিবেচনায় রাখা দরকার। কারণ প্যাকেটে দেওয়া পুষ্টির হিসাব অনেক সময় নির্দিষ্ট পরিমাণ খাবারের জন্য দেওয়া থাকে। শিশু বাস্তবে যতটা খাবার খাচ্ছে, তার সঙ্গে সেই হিসাব মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, প্যাকেটের সামনে ‘১০০ শতাংশ প্রাকৃতিক’, ‘স্বাস্থ্যকর’ বা এ ধরনের আকর্ষণীয় দাবি থাকলেই খাবারটিকে নিরাপদ বা পুষ্টিকর ধরে নেওয়া ঠিক নয়। উপাদান তালিকা ও পুষ্টিমান দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। বিশেষ করে দুই বছরের কম বয়সী শিশুর খাবারে বাড়তি চিনি না দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মালিহা শিফার মতে, প্যাকেটজাত খাবার এখন দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। তাই শিশুরা যে খাবার খাচ্ছে, সেটিতে কত চিনি, লবণ ও চর্বি রয়েছে—তা অভিভাবকদের সহজভাবে জানার সুযোগ থাকা প্রয়োজন।

তার মতে, খাদ্যপণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের প্রথম দায়িত্ব পণ্যের নিরাপত্তা ও পুষ্টিমান নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে মোড়কের তথ্য এমনভাবে উপস্থাপন করা দরকার, যাতে সাধারণ একজন অভিভাবকও দ্রুত তা বুঝতে পারেন। শিশুদের লক্ষ্য করে প্রচারের ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীল নীতি প্রয়োজন।

সিএসআর পেরিয়ে মূল ব্যবসায় দায়বদ্ধতা

সাইফের মা নাজমা আক্তারের প্রশ্নটি তাই গুরুত্বপূর্ণ—“প্যাকেটের গায়ে এত কথা লেখা থাকে। কিন্তু কোন তথ্য দেখে আমি বুঝব খাবারটি আমার সন্তানের জন্য কতটা ভালো?”

এই প্রশ্নের সহজ ও নির্ভরযোগ্য উত্তর অভিভাবকের হাতে থাকা প্রয়োজন। কারণ শিশুরা নিজের খাদ্যবাজার তৈরি করেনি, কিন্তু সেই বাজারের বড় একটি ভোক্তা তারা। তাই কোনো শিশুর জন্য তৈরি খাবার মূল্যায়নে শুধু স্বাদ, আকর্ষণীয় প্যাকেট বা সামনে লেখা পুষ্টির দাবি দেখলেই হবে না।

আরও পড়ুন

দেখতে হবে খাবারটি কীভাবে তৈরি হয়েছে, পণ্যের তথ্য কতটা স্বচ্ছ, পুষ্টিমান কতটা নির্ভরযোগ্য, কীভাবে সেটি বাজারজাত করা হচ্ছে, শিশুর স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং অভিযোগ বা ঝুঁকি দেখা দিলে প্রতিষ্ঠান কী ব্যবস্থা নিচ্ছে।

একটি প্রতিষ্ঠান শিশুদের জন্য বৃত্তি দিতে পারে, স্বাস্থ্যসেবা দিতে পারে বা পুষ্টি কর্মসূচি পরিচালনা করতে পারে। এসব উদ্যোগ সামাজিক দায়বদ্ধতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু শিশুর অধিকার রক্ষার প্রশ্ন সেখানেই শেষ হয় না।

প্রতিষ্ঠানের পণ্য, বিপণন কৌশল, প্যাকেজিং, তথ্য প্রকাশ, ভোক্তার নিরাপত্তা এবং পরিবেশের ওপর প্রভাব—সবকিছু মিলিয়েই তার দায়িত্বশীলতা বিবেচিত হয়। অর্থাৎ সামাজিক দায়বদ্ধতা শুধু প্রতিষ্ঠানের বাইরে পরিচালিত কোনো কর্মসূচি নয়; মূল ব্যবসা কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তার মধ্যেও সেই দায়বদ্ধতার প্রকাশ থাকা প্রয়োজন।

শিশুর প্লেটে শেষ পর্যন্ত কী যাচ্ছে, সেই সিদ্ধান্ত শুধু পরিবারের হাতে নেই। এর সঙ্গে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, বাজার, নীতিনির্ধারক এবং ভোক্তার দায়িত্বও জড়িত। তাই শিশু অধিকারভিত্তিক করপোরেট দায়বদ্ধতার বড় পরীক্ষা কোনো একটি সিএসআর কর্মসূচিতে নয়, বরং প্রতিদিনের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD