Logo

ব্রডব্যান্ড সেবার চিত্র বদলে দিতে পারে ‘অ্যাকটিভ শেয়ারিং’

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৪ আগস্ট, ২০২৬, ১৩:৪১
ব্রডব্যান্ড সেবার চিত্র বদলে দিতে পারে ‘অ্যাকটিভ শেয়ারিং’
ছবি: সংগৃহীত

দেশের ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে ‘অ্যাকটিভ শেয়ারিং’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় গাইডলাইন প্রণয়নের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

কমিশন জানিয়েছে, প্রাথমিক খসড়া ইতোমধ্যে প্রস্তুত হয়েছে। অংশীজনদের মতামত পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত নীতিমালা প্রকাশ করা হবে। এরপর পরীক্ষামূলক বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে সারা দেশে এ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

অ্যাকটিভ শেয়ারিং চালু হলে একই ফাইবার অপটিক অবকাঠামো ব্যবহার করে একাধিক ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান (আইএসপি) গ্রাহকদের ব্রডব্যান্ড সংযোগ দিতে পারবে। ফলে একই এলাকায় আলাদাভাবে নতুন কেবল, সুইচ, ডিস্ট্রিবিউশন বক্স ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি স্থাপনের প্রয়োজন অনেকটাই কমে যাবে। এতে অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় হ্রাসের পাশাপাশি শহরের দীর্ঘদিনের ঝুলন্ত তারের জটও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

খাতসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রাজধানীর ধানমন্ডিকে দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অ্যাকটিভ শেয়ারিং জোন হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে কয়েক বছর ধরে সীমিত পরিসরে পরিচালিত একটি মডেলের অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করা হচ্ছে। ফল ইতিবাচক হলে রাজধানীর অন্যান্য এলাকা এবং পরে পর্যায়ক্রমে দেশের বড় শহরগুলোতে এ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বর্তমানে দেশের শহরাঞ্চলে একই এলাকায় একাধিক আইএসপি নিজস্ব নেটওয়ার্ক নির্মাণ করে। ফলে একই সড়ক বা ভবনে বারবার ফাইবার অপটিক কেবল বসাতে হয়। এতে একদিকে যেমন ব্যয় বাড়ে, অন্যদিকে বিদ্যুতের খুঁটি ও ভবনের দেয়ালে তারের জট তৈরি হয়ে নগর ব্যবস্থাপনায় জটিলতা সৃষ্টি হয়।

এই সমস্যার সমাধান হিসেবেই অ্যাকটিভ শেয়ারিং মডেলকে সামনে আনা হচ্ছে। নতুন ব্যবস্থায় একটি অবকাঠামো ব্যবহার করেই বিভিন্ন আইএসপি নিজেদের ব্র্যান্ড, প্যাকেজ ও গ্রাহকসেবা নিয়ে প্রতিযোগিতা করবে। ফলে প্রতিযোগিতা অবকাঠামো নির্মাণে নয়, বরং সেবার মান ও মূল্যের ওপর নির্ভর করবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের অনেক দেশেই যৌথ অবকাঠামো ব্যবহারের এ মডেল সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। এতে অপ্রয়োজনীয় বিনিয়োগ কমেছে, নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনা সহজ হয়েছে এবং গ্রাহকসেবার মানও বেড়েছে। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এ ব্যবস্থা চালু হলে ব্রডব্যান্ড খাতের দীর্ঘদিনের বিভিন্ন কাঠামোগত সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে।

বিজ্ঞাপন

বর্তমানে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে নতুন গ্রাহক সংযোগ দিতে গেলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে নতুন করে ফাইবার কেবল স্থাপন করতে হয়। এতে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মূলধনি ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি আইএসপিগুলোর জন্য এ ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

অ্যাকটিভ শেয়ারিং কার্যকর হলে এসব প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে কম খরচে নতুন এলাকায় সেবা দিতে পারবে। এতে নতুন উদ্যোক্তাদের বাজারে প্রবেশ সহজ হবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো অবকাঠামো নির্মাণের পরিবর্তে সেবার মান উন্নয়ন ও গ্রাহকসেবায় বেশি বিনিয়োগ করতে পারবে।

সাধারণ গ্রাহকরাও এ ব্যবস্থার বড় সুবিধাভোগী হবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে অনেক এলাকায় একটি বা দুটি আইএসপির আধিপত্য থাকায় গ্রাহকদের বিকল্প সীমিত। এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে যেতে নতুন সংযোগ ও কেবল স্থাপনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু অ্যাকটিভ শেয়ারিং চালু হলে একই অবকাঠামো ব্যবহার করেই সহজে সেবাদাতা পরিবর্তন করা সম্ভব হবে। এতে প্রতিযোগিতা বাড়বে, সেবার মান উন্নত হবে এবং মূল্যও আরও প্রতিযোগিতামূলক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্টদের মতে, যৌথ অবকাঠামো পেশাদারভাবে পরিচালিত হলে নেটওয়ার্কের স্থিতিশীলতাও বাড়বে। কোনো অপারেটরের সেবা ব্যাহত হলেও বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত সংযোগ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে। ফলে গ্রাহকদের ভোগান্তি কমবে এবং নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা সহজ হবে।

ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) সাধারণ সম্পাদক নাজমুল করিম ভূঁইয়া বলেন, বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই অ্যাকটিভ শেয়ারিং চালু রয়েছে এবং বাংলাদেশেও দীর্ঘদিন ধরে এ নীতিমালা বাস্তবায়নের দাবি জানানো হচ্ছে। তার মতে, একই এলাকায় বারবার নতুন কেবল বসানোর প্রয়োজন না থাকায় অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় কমবে, ঝুলন্ত তারের জট হ্রাস পাবে এবং গ্রাহক আরও উন্নতমানের ইন্টারনেট সেবা পাবেন।

তিনি আরও জানান, রাজধানীর ধানমন্ডিতে প্রায় চার বছর ধরে সীমিত পরিসরে অ্যাকটিভ শেয়ারিং মডেল চালু রয়েছে। বর্তমানে প্রায় আট হাজার সংযোগ এ ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে এবং উল্লেখযোগ্য কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

বিজ্ঞাপন

আইএসপিএবির সভাপতি আমিনুল হাকিম বলেন, বর্তমানে দেশে প্রায় ৫০ লাখ পরিবার ব্রডব্যান্ড সংযোগ ব্যবহার করছে। অথচ বিদ্যমান অবকাঠামো দিয়েই আরও প্রায় ১ কোটি ৬০ থেকে ১ কোটি ৭০ লাখ পরিবারকে সংযুক্ত করা সম্ভব। কিন্তু নীতিমালার অভাবে সেই সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

তার দাবি, দেশে বর্তমানে আইএসপি খাতে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে। কিন্তু বিদ্যমান অবকাঠামোর মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে। অ্যাকটিভ শেয়ারিং চালু হলে একই বিনিয়োগের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং দ্রুত ব্রডব্যান্ড সেবা সম্প্রসারণ সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

এদিকে বিটিআরসির স্পেকট্রাম ম্যানেজমেন্ট বিভাগের পরিচালক ড. মো. সোহেল রানা জানিয়েছেন, অ্যাকটিভ শেয়ারিং গাইডলাইন বর্তমানে প্রণয়নের পর্যায়ে রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় কাজ এগিয়ে চলছে।

বিজ্ঞাপন

বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী বলেন, প্রাথমিক খসড়া প্রস্তুত হয়েছে। এখন অংশীজনদের মতামত, প্রযুক্তিগত দিক এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা বিবেচনা করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও কার্যকর গাইডলাইন চূড়ান্ত করা হবে। ভবিষ্যতে মোবাইল ফোন অপারেটরদেরও এ ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে কি না, সে বিষয়েও আলোচনা চলছে।

এর আগে চলতি বছরের এপ্রিলে অ্যাকটিভ শেয়ারিং বাস্তবায়নের বিষয়ে নীতিগত আলোচনা শুরু হয়। ৩০ এপ্রিল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিটিআরসি ভবনে ‘টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো শেয়ারিং’ শীর্ষক কর্মশালায় মোবাইল অপারেটর, এনটিটিএন, টাওয়ার কোম্পানি, আইএসপি, আইএসপিএবি, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল), সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞসহ প্রায় ১৩০ জন প্রতিনিধি অংশ নেন।

কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা মত দেন, অ্যাকটিভ শেয়ারিং চালু হলে অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় কমবে, দ্রুত নতুন এলাকায় ইন্টারনেট সেবা পৌঁছানো যাবে, ঝুলন্ত তারের জট কমবে এবং গ্রাহকরা আরও মানসম্মত ও নির্ভরযোগ্য ব্রডব্যান্ড সেবা পাবেন।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD