বিতর্কিতকাণ্ডে বাদ পড়তে পারেন যেসব মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী

আগামী ১৭ আগস্ট বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ছয় মাস পূর্ণ হতে যাচ্ছে। এ সময়কে সামনে রেখে মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের পরিবর্তনের আলোচনা জোরালো হয়েছে। সরকার ও দলীয় সূত্রগুলোর দাবি, ছয় মাসের কর্মদক্ষতা, ভাবমূর্তি, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও দায়িত্ব পালনের সামগ্রিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকে সরিয়ে নতুন মুখ অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বিএনপির বিভিন্ন সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গত ছয় মাসে মন্ত্রীদের কার্যক্রম নিয়ে সরকারের ভেতরে-বাইরে পর্যালোচনা চলছে। মন্ত্রণালয়গুলোর কাজের গতি, প্রশাসনিক দক্ষতা, জনসম্পৃক্ততা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবং সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষায় সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা মূল্যায়ন করা হচ্ছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করতে না পারা কিংবা বিভিন্ন বিতর্কে জড়ানো কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে বিশেষভাবে আলোচনা চলছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বর্তমানে ২৪ মন্ত্রী ও ২৪ প্রতিমন্ত্রীর কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন করা হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। এই মূল্যায়নের ফলের ভিত্তিতেই মন্ত্রিসভায় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত আসতে পারে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পুনর্বণ্টন এবং প্রয়োজনে মন্ত্রিসভার আকার বাড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিএনপির একটি সূত্রের দাবি, দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছু মন্ত্রী প্রত্যাশিত গতিতে কাজ করতে পারেননি। বিশেষ করে নিষ্ক্রিয়তা, সমন্বয়হীনতা ও অপ্রয়োজনীয় বক্তব্য নিয়ে দলের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ছয় মাসের মূল্যায়ন শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে সূত্রটি জানিয়েছে।
সূত্রের দাবি, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় মন্ত্রণালয়গুলোর কাজের অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কোন ফাইল কতদিন আটকে আছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে কতটা সময় লাগছে এবং মাঠপর্যায়ে নেওয়া সিদ্ধান্তের বাস্তব ফল কী—এসব বিষয়ও মূল্যায়নের আওতায় রয়েছে। মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং দায়িত্ব পালনে অহমিকা মন্ত্রণালয়ের কাজের গতি কমিয়ে দিচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
কর্মদক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক ভারসাম্য বিবেচনায় রেখেও মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। ফলে কয়েকজন বর্তমান মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নতুন মুখ আনার সম্ভাবনা রয়েছে বলে দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সম্ভাব্য নতুন মুখ নিয়েও বিএনপির ভেতরে আলোচনা চলছে। রাষ্ট্রপতি বা স্পিকার পদে নতুন কাউকে মনোনয়ন দেওয়া না হলে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান ও সেলিমা রহমানের নাম সম্ভাব্য মন্ত্রিসভা সদস্য হিসেবে আলোচনায় রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
এ ছাড়া সম্ভাব্য নতুন মুখ হিসেবে বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, জাতীয় সংসদের হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান, এ বি এম মোশাররফ হোসেন, মাহিদুর রহমান ও এরশাদুল্লাহ খানের নামও বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনায় রয়েছে। এ তালিকায় ব্যারিস্টার নওশাদ জামিরের নামও ঘুরেফিরে আসছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
ভৌগোলিক ভারসাম্য রক্ষায় বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলের কয়েকজন নেতাকেও মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে বলে সূত্রের দাবি। আলোচনায় থাকা নামগুলোর মধ্যে রয়েছেন মোহাম্মদ শাহজাহান, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুবুদ্দিন খোকন, বরকতউল্লাহ বুলু ও জয়নুল আবেদিন ফারুক।
এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী থেকে দুজন তরুণ সংসদ সদস্য এবং নেত্রকোনা ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ থেকে একজন প্রভাবশালী নারী সংসদ সদস্যকে মন্ত্রিসভায় আনার বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
টেকনোক্র্যাট কোটাতেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। এ ক্ষেত্রে সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবং বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিবুন নবী খান সোহেলের নাম আলোচনায় রয়েছে। তবে নতুনদের জায়গা দিতে গিয়ে ঢাকা ও খুলনা বিভাগের কয়েকজন বর্তমান মন্ত্রীর দায়িত্বে পরিবর্তন আসতে পারে বলেও দাবি করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এদিকে কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্বের চাপ কমানোর বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। বিশেষ করে সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব একজনের হাতে থাকায় কাজের গতি ও প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বলে সূত্রের দাবি। দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়ার মাধ্যমে এসব মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম আরও গতিশীল করার পরিকল্পনা থাকতে পারে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর দায়িত্ব নিয়েও আলোচনা চলছে। তিনি অর্থ ও পরিকল্পনা—দুটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। সূত্রের দাবি, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব অন্য কারও কাছে দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে বেশি মনোযোগ দেওয়ার বিষয়ে তার আগ্রহ রয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে কর্মদক্ষতা ও স্থবিরতা নিয়ে নূরুল হক নূর ও জুনায়েদ সাকির নামও আলোচনায় রয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলনের ভূমিকা নিয়েও দলের ভেতরে মূল্যায়ন চলছে বলে দাবি করা হয়েছে। অতিকথন এবং শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা কমে যাওয়ার বিষয়টি তার দায়িত্ব পরিবর্তনের আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে সূত্রের দাবি।
মন্ত্রিসভায় শরিক ও সমমনা দলগুলোর কয়েকজন নেতাকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে। এ তালিকায় নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ এবং বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের নাম বিভিন্ন সূত্রে এসেছে।
সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার পর সম্ভাব্য এই রদবদলকে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। মন্ত্রিসভার পরিবর্তনের মাধ্যমে কাজের গতি বাড়ানো, সমন্বয়হীনতা কমানো এবং সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন আরও কার্যকর করার লক্ষ্য থাকতে পারে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
সূত্রগুলোর দাবি, মন্ত্রীদের মূল্যায়নে নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অগ্রগতি, প্রশাসনিক জটিলতা দূর করার সক্ষমতা, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে নেওয়া উদ্যোগ, মাঠ প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জাতীয় সংসদে সক্রিয় অংশগ্রহণের মতো বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেন, মন্ত্রিসভায় রদবদল একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরাসরি দেখছেন।








